দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি তীব্র রূপ ধারণ করায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার কারখানাগুলো মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাসের সরবরাহ পাচ্ছে। ফলে সারা দেশে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের পাশাপাশি কৃষি খাতের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সার উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক সংলাপে এই তথ্য উঠে এসেছে। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর।
সিপিডি বলছে, গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন কমে যাওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে নানা অস্থিরতার কারণে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি করতে না পারায় গ্যাস-সংকট বাড়ছে। দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস না মেলায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে সার কারখানায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইউরিয়া সারের দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা সামনের কৃষি মৌসুমে সারের ঘাটতি ও অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
জ্বালানি খাতের এই অচলাবস্থার পেছনে বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় দায় বলে জানিয়েছে সিপিডি। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতার থেকে নির্ধারিত চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এই ঘাটতি মেটাতে পেট্রোবাংলাকে বাধ্য হয়ে খোলাবাজার বা ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। তবে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১৬-১৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা সরকারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
সিপিডির হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে সরকারের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয়ের কারণে পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি বিল প্রায় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে জ্বালানি পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। এফএসআরইউ মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই।
মন্ত্রী আরও বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে চলমান সংকট শুরু হয়েছিল। যদিও বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কারণ, নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না থাকা পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়াও সম্ভব নয়।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া; আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়।’
সংলাপের সূচনা বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘জ্বালানি এমন একটি পণ্য ও সেবা, যা ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। তবে বাস্তবতা হলো, আমরা এখন এই সংকটের মধ্যেই রয়েছি।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের অভিঘাত বহুমাত্রিক উল্লেখ করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আগে আমরা মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার কথা বলতাম। কিন্তু এখন তাৎক্ষণিকভাবে কী করতে হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানিসংকটকে একটি পুঞ্জীভূত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘জ্বালানিসংকটের ফলে নতুন কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমরা এমন একটি অবস্থানের মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।’
সিপিডির প্রবন্ধে এলপিজি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে বলে জানানো হয়। সিপিডি জানায়, দেশে ব্যবহৃত এলপিজির বেশির ভাগ আসছে বেসরকারি আমদানির মাধ্যমে, যেখানে সরকারি খাতের অবদান নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশের নিচে। দেশের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ দশমিক ৭ শতাংশ মেটাতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির মাধ্যমে, যা গৃহস্থালি রান্নার জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আলোচনা সভায় এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাতসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।