দেশের বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের আলোচিত, বিতর্কিত ব্যবস্থাটি। চুক্তির মধ্য দিয়ে আপাত-নিয়মতান্ত্রিকভাবে হলেও পর্যবেক্ষকেরা এ ব্যবস্থাকে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সরকারের ওপর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিশোধ করা ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত দেড় দশকে এ বাবদ খরচ বেড়েছে ৯ গুণ। আর এর চাপ এসে পড়ছে ভোক্তার ঘাড়েও।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্থ উপার্জনের মূল উপায় বিদ্যুৎ বিক্রি করা। সেহেতু তাদের যেন ক্ষতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বন্ধের সময়ের জন্যও পিডিবিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে একটি চার্জ দিতে হয়। চুক্তির সময় এটি নির্ধারণ করা থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে দেওয়া এই অর্থই হলো ক্যাপাসিটি চার্জ।
পিডিবি বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে আগে বলেছে, তারা হিসাব করে যখন দেখে, ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়াই বেশি সাশ্রয়ী, তখন ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কার্যত সরকার ও জনগণের জন্য বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ টাকা পরিশোধ করে যেতে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি মিলিয়ে মোট ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দেশের শতভাগ এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসার পরও চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উঠছে না। অন্যদিকে গড়ে দৈনিক ১২ হাজার মেগাওয়াট হারে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুতের গড় উৎপাদনের দ্বিগুণের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে।
সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জের বিধান নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইন করে। এর আওতায় যেসব বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়, সেগুলো বসিয়ে রাখলেও উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয়, কেন্দ্রের দক্ষতাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করে বিদ্যুতের একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বর্তমানে দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। আর সরকারি কেন্দ্র রয়েছে ৫৫টি, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট। হিসাবের বাকি বিদ্যুৎ আসে ভারত ও নেপাল থেকে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে তখনকার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, আগের ১৪ বছরে ৮২টি বেসরকারি এবং ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সরকার।
বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বিষয়টি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনকারীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে আসছে।
অতি সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এখন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এই চুক্তি পর্যালোচনা করা যাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার সংস্কার না করে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখেছিল।
বিদ্যুৎমন্ত্রী সেদিন আরও বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যুতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। অনুকূল মতামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পিডিবির হিসাব ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল, যাতে খরচ হয় ৫৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। ওই বছর বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে ৫ হাজার ৪৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে দিতে হয়েছিল। ফলে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা।
পরের বছর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৪১০ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হয় ৬০ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। ওই বছর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ হয়েছিল ৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ইউনিটপ্রতি ২ টাকা ৫০ পয়সা।
কিছু বেসরকারি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ কমে ইউনিটপ্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা হয়। পরের তিন অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ প্রতি ইউনিটের জন্য ২ টাকার নিচে ছিল। ২০১৭-১৮ সালে আবার তা বেড়ে ইউনিটপ্রতি ২ টাকা এবং তার পরের বছর ২ টাকা ৩৯ পয়সা হয়।
এর পরের বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি বড় মাপের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যোগ দেওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জ সাময়িক ব্যতিক্রম ছাড়া বাড়তে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ ছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা, পরের বছর ২ টাকা ৭২ পয়সা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আবার ২ টাকা ৩৮ পয়সা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়। সে বছর ইউনিট প্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় ৩ টাকা ৫৫ পয়সা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে আরও বেশি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়। ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয় ৪ টাকা ৬৯ পয়সা হারে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ গেছে ৫ টাকা ২৪ পয়সা হারে। সে বছর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট খরচ হয়েছিল ৪৫ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ৪২৭ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় হবে ৪ লাখ ৮২ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ হবে ৫ টাকা ১২ পয়সা।
আর আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ৯ হাজার ৬৩৬ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হবে বিবেচনায় মোট ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮১ কোটি টাকা খরচ প্রাক্কলন করেছে বিইআরসি। এতে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৪৬ পয়সা হারে খরচ হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ১৯৯৮ সালে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জ বা ‘ফিক্সড কস্ট’ পরিশোধের প্রচলন শুরু হয়। বেশ কিছুটা সময় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র কম থাকায় ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ বোঝা যায়নি। কিন্তু ২০১০ সালের পর উদ্বৃত্ত বা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই চার্জ বোঝা হয়ে উঠতে থাকে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম করণীয় বিষয়ে আজকের পত্রিকার প্রশ্নে বলেন, ‘বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ যে আসলে একটি লুটপাটের প্রকল্প, তা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। তৎকালীন সরকার বিষয়টি স্বীকার না করলেও বিএনপি সরকারে এসে এখন স্বীকার করছে। এখন ক্যাপাসিটি চার্জ উঠিয়ে দেওয়া কিংবা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আইনি বাধা সামনে এসেছে। আমরা বলছি, এসব জ্বালানি অপরাধ চিহ্নিত করতে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন জরুরি।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম মনে করেন, আগের সরকারের অন্যায্য ও লুণ্ঠনমূলক চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। সুতরাং সেই অধিকার ফিরিয়ে আনার সুযোগও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইন বাতিল করা হলেও এই চুক্তির অধীনে করা চুক্তিগুলোর বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এগুলো আমাদের জন্য সমস্যা।’
বিদ্যুৎ খাতে ভোক্তাস্বার্থবিরোধী চুক্তির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা করার পরামর্শ দেন এই অধ্যাপক। বিদ্যুৎ খাতে অন্যায্য ক্রয় চুক্তিগুলোর জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক বিদ্যুৎসচিব আহমেদ কায়কাউস, সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও সাবেক বিদ্যুৎসচিব মনোয়ার ইসলামের নাম উল্লেখ করে এসব শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার তাগিদ দেন শামসুল আলম।