আওয়ামী লীগ ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে ২০০৮ সালের পর থেকে বিরোধী দল, জামায়াত–শিবির, বিএনপিসহ ভিন্ন মতের লোকদের গুম–খুন, ক্রসফায়ার এবং পায়ে গুলি করে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হতো। যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলির ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন ভুক্তভোগী ইসরাফিল হোসেন। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচার শুরু হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ।
চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন মঙ্গলবার জবানবন্দিতে বলেন, বর্তমানে তিনি যশোরে ইবনে সিনা হাসপাতালে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। যখন তিনি আক্রান্ত হন, তখন চৌগাছা থানা শিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া রুহুল আমিন ছিলেন তখনকার চৌগাছা থানা শিবিরের সাহিত্য সম্পাদক।
ইসরাফিল হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে তিনি ও তাঁর বন্ধু রুহুল আমিন মোটরসাইকেলে করে যশোর শহর থেকে চৌগাছার নারায়ণপুরে যাচ্ছিলেন। চৌগাছার বন্দলীতলা গ্রামে পৌঁছালে পুলিশ তাঁদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ওই দিন রাত ১১টার পর তাঁদের চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানের কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে তারা জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরলে ওসি ভিডিও কলে এসপি আনিসুর রহমানকে বলে তার নির্দেশ অনুযায়ী তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইসরাফিল বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে কারা জড়িত, তা তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। সে সময় এসআই আকিকুল তাদের গুলি করে দিতে বলেন ওসিকে। পরদিন তাদের ডিবি অফিসে নেওয়া হয়। সেখানে ডিবির এক কর্মকর্তা তাদের বলেন, এসপির নির্দেশ আছে রাতে ক্রসফায়ার দেওয়ার। ওই দিন সন্ধ্যার পর এসআই আকিকুলের নেতৃত্বে ডিবি অফিস থেকে তাঁদের নিয়ে চৌগাছা থানায় নেবার সময় পথিমধ্যে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁদেরকে হাতকড়া পরানো হয় এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা হয়। বন্দলীতলা মাঠের পাশে তোতা মিয়ার বাড়ির সামনে তাঁদের গাড়ি থেকে নামায় এবং রাস্তার পাশে দাঁড় করানো হয়। একপর্যায়ে ওসি মশিউর বলেন ফায়ার। সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ হয়। তখন বন্ধু রুহুল আমিন ‘মাগো’ বলে চিৎকার করে উঠে। কিছুক্ষণ পর তার বাম পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। তিনি পরে গেলে হ্যান্ডকাফ এবং চোখের বাঁধন খুলে দেয়। এরপর ধুলাবালি ক্ষতস্থানে মেখে গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়।
ইসরাফিল আরও বলেন, তিনি চোখ খুলে দেখেন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রুহুল আমিন পড়ে আছে। এ সময় তিনি ওসি মশিউর, এসআই আকিকুল, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল জহুরুল ও সাজ্জাদকে দেখতে পান। ক্ষতস্থানে বালু দেওয়ার কারণে ইনফেকশন হলে তাদের পায়ে পচন ধরে যায়। পরে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হলে তার বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। এ সময় সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে তাঁর বাঁ পা দেখান, যা হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।
জবানবন্দিতে ইসরাফিল বলেন, পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলে পুলিশ তাদেরকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। কারাগারে থাকতে পায়ে গুলি করে পঙ্গু বানিয়ে দেওয়া বেশ কয়েকজনকে দেখতে পান তারা। ওই পুরো ঘটনার জন্য আনিসুর রহমান, মশিউর রহমান, আকিকুল ইসলাম, মাজেদ, সাজ্জাদ ও জহুরুলের শান্তি চান তিনি।