বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাপনায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে। ক্যাশলেস লেনদেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে বন্দী গণনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে কারাগারটিকে শতভাগ ডিজিটালাইজড করেছে কারা অধিদপ্তর।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেনের পরিকল্পনায় এবং প্রিজন্স আইসিটি সেল ও ডিকোড ল্যাবের যৌথ বাস্তবায়নে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় বন্দীদের আত্মীয়-স্বজন কারাগারে এসে বা নির্ধারিত ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে পারবেন। জমাকৃত অর্থ বন্দীর ব্যক্তিগত ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে। এরপর থেকে বন্দীরা কারাগারের ক্যানটিন বা অনুমোদিত সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করতে পারবেন। ফলে কারাগারের ভেতরে নগদ টাকার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হবে।
কারা কর্মকর্তারা বলছেন, এতে একদিকে যেমন অর্থ লেনদেনে স্বচ্ছতা আসবে, অন্যদিকে বন্দীদের অর্থ হারিয়ে যাওয়া, চুরি হওয়া বা অনিয়মের অভিযোগও কমে যাবে।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আরএফআইডি প্রযুক্তি। প্রত্যেক বন্দীর জন্য একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে বন্দীদের অবস্থান, ওয়ার্ডভিত্তিক উপস্থিতি এবং গণনা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
কোনো বন্দী জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট অর্থ মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং বা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলন করতে পারবেন।
ফলে মুক্তির সময় নগদ অর্থ ফেরত দেওয়া, হিসাব যাচাই বা প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকাংশে কমে আসবে।
কারা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত বন্দীর চাপে রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ জন হলেও বর্তমানে বন্দী রয়েছেন ৭৭ হাজারের বেশি। অর্থাৎ কারাগারগুলো প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি বন্দী ধারণ করছে।
এত বিপুলসংখ্যক বন্দীর অর্থ লেনদেন, ক্যানটিন ব্যবস্থাপনা ও হিসাব রক্ষণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কারা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালুর ফলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং বন্দী কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কারাগার আধুনিকায়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ও স্বজনদের যোগাযোগ সহজ করতে ইন্টারকমভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে বন্দীদের স্বজনদের সঙ্গে নির্ধারিত সময় ফোনে কথা বলার সুযোগ চালু করা হয়েছিল, যা কারা ব্যবস্থাপনায় মানবিকতার নতুন মাত্রা যোগ করে।
এ ছাড়া চলতি বছরের এপ্রিলে কারা অধিদপ্তর সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে চুক্তি করে বন্দীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার বাস্তব রূপ এখন দেখা যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে।
কারা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, নগদ অর্থের ব্যবহার কমানো গেলে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগও কমে যায়।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে অতীতে মোবাইল ফোন, মাদক এবং অবৈধ লেনদেন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও নগদহীন ব্যবস্থা এসব ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জে সফল বাস্তবায়নের পর পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারেও ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন বলেন, কারাগারে লেনদেনের স্বচ্ছ করার জন্য ডিজিটালাইজ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধীরে ধীরে দেশের সকল কারাগারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।