সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা, হিজরি নববর্ষ উদ্যাপন এবং দেশের কতিপয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হারে কালিমাখচিত পতাকা প্রদর্শন ও মিছিলের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সর্বজনশ্রদ্ধেয় ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি চিন্তাবিদেরা।
আজ বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে আলেম সমাজ জানিয়েছে, পবিত্র কালিমা প্রতিটি মুসলমানের ইমানের প্রাণ এবং এর প্রতি সবার অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গণহারে এই পতাকার ব্যবহার ইসলাম, মুসলিম সমাজ কিংবা দেশের ভাবমূর্তি—কোনোটির জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না।
বিবৃতিতে ওলামায়ে কেরাম বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এগুলোর প্রচারণা এত ব্যাপক হয়েছে যে, দেশের অভ্যন্তর এমনকি বহির্বিশ্বেও এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও নানা রকম আশঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের সর্বজন স্বীকৃত ওলামায়ে কেরাম, ইসলামি দলসমূহের নেতা এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার তথা জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রশাসনে উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে।
কালিমাখচিত পতাকা তৈরি ও উত্তোলন করা জায়েজ। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশের চলমান প্রেক্ষাপটে এসব পতাকার ব্যাপক ব্যবহার এবং তরুণদের হাতে হাতে বহন প্রতিবেশী বা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বমোড়লদের প্রচারণায় বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ন্যারেটিভ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
হাদিস ও সিরাত গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে দেশের বিজ্ঞ স্কলাররা জানান, হাদিস ও সিরাত গ্রন্থসমূহে রাসুলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবায়ে কেরামের যুগে সাদা, কালো বা কালিমাখচিত পতাকার ব্যবহার কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা যেত। যুদ্ধক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কোনো সময়ে পূর্বসূরি মুসলিমেরা হাতে হাতে পতাকা উড্ডীন করে মিটিং মিছিল করেছেন বলে কোরআন, হাদিস বা ফিকহের কিতাবসমূহে পাওয়া যায় না।
ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা হলো, সমাজ বা দেশে ফিতনার আশঙ্কা হলে অনেক জায়েজ কাজও পরিত্যাগ করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘যদি সমাজে ফিতনা তৈরির আশঙ্কা না থাকত, তাহলে আমি কাবাগৃহকে ভেঙে হজরত ইবরাহিমের (আ.) ভিত্তির ওপর তথা হাতিমসহ পুনর্নির্মাণ করতাম।’ অর্থাৎ কাবাগৃহ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে বৈধ হওয়া সত্ত্বেও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির আশঙ্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.) কাজটি করেননি।
বিবৃতিতে সৌদি আরব ও আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় পতাকার উদাহরণ টেনে বলা হয়, পবিত্র হারামাইনের দেশ সৌদি আরবের পতাকায় কালিমা ও তরবারির চিত্র অঙ্কিত। আফগানিস্তানের পতাকায়ও কালিমাখচিত। যা কেবল সে দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। সেসব পতাকাও নাগরিকেরা দায়িত্ব মনে করে সসম্মানে সমুন্নত রাখেন। কালিমাখচিত হওয়ায় সৌদি আরবের পতাকা কখনো অর্ধনমিতও করার বিধান নেই। অথচ আমাদের দেশের এসব পতাকার একটি অংশ কর্মসূচির পর অবহেলিত ও পদদলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অবমাননার আশঙ্কা থাকায় মুসলিম স্কলাররা পতাকায় কালিমা তাইয়েবা লেখা বা কালিমাযুক্ত পতাকা গণহারে ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
সুতরাং কালিমাখচিত পতাকার সম্মান করা জরুরি। খেলাধুলার পতাকার কাউন্টারে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ খচিত পতাকার গণব্যবহারে পবিত্র কালিমাখচিত পতাকার সম্মান ক্ষুণ্ন হবে। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের পতাকা যত্রতত্র পড়ে থাকলে গুনাহ হবে না। কিন্তু পবিত্র কালিমার পতাকা যত্রতত্র পড়লে বা ময়লা-আবর্জনায় পদদলিত হলে কেবল গুনাহই হবে না; বরং কোটি কোটি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত লাগবে।
এই স্পর্শকাতর জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুটির সমাধান এবং কালিমার মর্যাদা রক্ষায় দেশের ওলামায়ে কেরাম ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন বলে তাঁরা অভিমত দেন।
এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন মধুপুরের পীর মাওলানা আবদুল হামিদ, দেশের অন্যতম শীর্ষ ফকিহ মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, দেওনা দরবারের পীর অধ্যক্ষ মাওলানা মিজানুর রহমান, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মহাসচিব মুফতি মাহফুজুল হক, মুফতি মনির হুসাইন কাসেমী, মাওলানা মোসাদ্দেক বিল্লাহ মাদানী, আফতাবনগর মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি মোহাম্মদ আলী, লালখান বাজার মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি হারুন এজহার এবং জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হোরায়রা। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য শীর্ষ আলেমদের মধ্যে মাওলানা শরীফুল্লাহ, মাওলানা মাহমুদ হাসান গুনভী, মাওলানা আজহারুল ইসলাম, মাওলানা মহিউদ্দিন একরাম, মাওলানা এজহারুল হক, মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ, মাওলানা ড. ওয়ালীয়ুর রহমান খান, মাওলানা মীর ইদরিস, মুফতি মো. আবদুল্লাহ, মাওলানা আনিসুজ্জামান সিকদার, মাওলানা জাকির হোসেন খান, মাওলানা আহমদ রফিক, মাওলানা মহিউদ্দিন এবং মাওলানা ছানাউল্লাহ আজহারীসহ আরও অনেকে এই বিবৃতিতে একাত্মতা পোষণ করে মুসল্লি ও সমাজকে সঠিক নির্দেশনা দিতে বিজ্ঞ আলেমদের সুচিন্তিত মতামতের প্রতি জোর দিয়েছেন।