বাংলাদেশের একটি সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া দুটি রিংটেইলড লেমুর ভারতের সবচেয়ে ধনী পরিবারের পরিচালিত একটি চিড়িয়াখানায় পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট আজকের পত্রিকার বরাত দিয়ে এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে আজকের পত্রিকা।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া তিনটি লেমুরের মধ্যে এই দুটি ছিল। পরে প্রাণীগুলো পাচার করে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
আফ্রিকার মাদাগাস্কারের স্থানীয় প্রাণী লেমুর। এটি বর্তমানে অত্যন্ত বিপন্ন বা সংকটাপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, চুরি হওয়া লেমুরগুলোকে ২০১৮ সালে শুল্ক বিভাগকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ঢাকার বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। পরে প্রাণীগুলো উদ্ধার করে সাফারি পার্কে নেওয়া হয়।
এখন প্রাণীগুলোকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়েছে ঢাকা। তবে প্রাণীগুলোর শরীরে মাইক্রোচিপ না থাকা, আলাদা শনাক্তকরণ নম্বর না থাকা এবং পরিচয় যাচাইয়ের জন্য সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল না থাকায় তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র আজকের পত্রিকা।
বাংলাদেশে এখনো থাকা ওই লেমুরটির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করার চেষ্টা করছেন কর্মকর্তারা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া দুই লেমুরের সঙ্গে সেটির রক্তের সম্পর্ক আছে কি না, তা নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে লেমুরগুলোকে ভারত পাচার করা হয়। পরে প্রায় ৪৮ লাখ ভারতীয় রুপি বা ৫ লাখ ৪ হাজার পাউন্ডে প্রাণীগুলো বিক্রি করা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন নিরাপত্তারক্ষীর সহায়তায় লেমুরগুলো চুরি করা হয়। এরপর সীমান্তের একজন লাইনম্যানের সহায়তায় সেগুলো ভারতে নেওয়া হয়। কয়েকজনের হাত ঘুরে প্রাণীগুলো ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জামনগরে পৌঁছায়। সেখানে বনতারা বন্যপ্রাণী কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সেগুলো বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই পাচার মামলায় সন্দেহভাজন আটজনের মধ্যে ছয়জন স্থানীয় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বনতারায় থাকা লেমুরগুলোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর প্রাণীগুলো উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট বনতারার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ভারতের গুজরাটে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর জায়গাজুড়ে বনতারা মূলত একটি চিড়িয়াখানা ও বন্যপ্রাণী কেন্দ্র। এটি রাধে কৃষ্ণ টেম্পল এলিফ্যান্ট ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট পরিচালনা করে। ট্রাস্টটি ভারতের শিল্প পরিবার রিলায়েন্সের সহায়তায় পরিচালিত হয়। রিলায়েন্সের মালিক এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি।
বনতারার পরিকল্পনা করেন মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানি। আম্বানি পরিবারের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী মোদি বনতারা চিড়িয়াখানার উদ্বোধন করেন।
তবে প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বনতারাকে সত্যিকারের সংরক্ষণ উদ্যোগ হিসেবে দেখার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। প্রাণী সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং বিরল প্রজাতির প্রাণী ও বিশাল অবকাঠামোর ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তারা বনতারার সমালোচনা করেছে।
এ ছাড়া উত্তরাখণ্ড ও মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্য থেকে প্রাণী স্থানান্তর করে এই বেসরকারি চিড়িয়াখানায় নেওয়ার কারণে সরকারি চিড়িয়াখানাগুলোর ওপর এর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো। বনতারার বিরুদ্ধে প্রাণী আমদানির নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্তৃপক্ষের নজরদারির মুখেও পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বনতারা এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।