রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলা, ভূমি ও বাড়ি দখল এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ৩৮ বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁরা এসব ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এসব ঘটনার জন্য সামগ্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আজ মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চরের খাসজমি দখল এবং বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনায় জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, বিগত কিছুদিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চরের খাসজমি দখল এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এসব ঘটনা কখনো প্রকাশ্য দিবালোকে, আবার কখনো রাতের অন্ধকারে ঘটছে।
বিবৃতিতে রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, স্থাপনা ভাঙচুর ও লুটপাট; মোহাম্মদপুরে কয়েক শ লোক নিয়ে হামলা-ভাঙচুর করে জমি দখলের অভিযোগ এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া পটুয়াখালীর চরবাংলা, নোয়াখালীর সদর উপজেলার ভাটিরটেক ও চরফ্যাশন এবং ভোলার চরসহ বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসীরা চরে বসবাসরত ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে জমি দখলের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলেও বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, এসবের বাইরে ঢাকা মহানগরসহ দেশের বড়-ছোট শহরগুলোতে ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে শিশু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কোনো এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসবই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতির ইঙ্গিত বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, জনমনে দৃঢ় বিশ্বাস, এসব ঘটনা শুধু সন্ত্রাসী কার্যক্রম নয়। এর সঙ্গে শাসকদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহল, পতিত সরকারের সশস্ত্র অনুসারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ সরাসরি জড়িত। এসব ঘটনা সারা দেশে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
এসব ঘটনার দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এবং দেশে-বিদেশে তাদের মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
অতীতের স্বৈরশাসনের বিভিন্ন সময়ে গোটা দেশ যেভাবে সন্ত্রাসীদের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল, বিভিন্ন ঘটনায় মনে হচ্ছে কয়েকটি মহল সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে বেপরোয়াভাবে তৎপর রয়েছে—এমন মন্তব্যও করা হয় বিবৃতিতে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শাসকদলের কোনো না কোনো পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা থাকায় পুলিশ যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা তাই এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর পাশাপাশি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এ সকল ঘটনায় শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি করার দায় রয়েছে।’
বিবৃতিতে সইকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, আইনজীবী জেড আই খান পান্না, সারা হোসেন ও সুব্রত চৌধুরী।
এ ছাড়া মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, লেখক রেহনুমা আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান ও দীপায়ন খীসা, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথসহ আরও অনেকে বিবৃতিতে সই করেছেন।