অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজের কাজের ফিরিস্তি দিয়েছেন। গতকাল রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘দেশের সেবা করার সুযোগ পেলে নাকি জান দিয়ে কাজ করবে? আসলে সে কিছুই করেনি। অপদার্থ একটা উপদেষ্টা। ইত্যাদি ইত্যাদি কতো কিছু শুনলাম এই দেড় বছরে।’
দীর্ঘ এই পোস্টে আসিফ নজরুল লেখেন, ‘ভাই, আমি কিছু করিনি। করেছে আমাদের আইন মন্ত্রণালয়। তবে এর প্রতিটি কাজে আমি অংশীদার ছিলাম। খুব সকালে অফিসে এসে প্রয়োজনে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত থেকেছি, সামান্য বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতে বাসায় আবার কাজ করেছি। বহু শুক্রবার, শনিবার সচিবালয়ে অফিস করেছি।’
‘আমাদের এই টিমওয়ার্কে কোন ফাঁকি ছিল না।’—উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা লেখেন, ‘আমি জানি তারপরও সমালোচনা করতে কারো কারো ভালো লাগবে। সেটা করেন, সমস্যা নাই। তবে আমার একান্ত অনুরোধ তার আগে, কি কি কাজ করা হয়েছে তা একটু জেনে নিন।’
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
কী কাজ হয়েছে?—উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এগুলো হলো: ১) ২২টি আইনি সংস্কার; ২) ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন; ৩) ২৪,২৭৬টি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার; ৪) গণহত্যার বিচার ব্যবস্থাপনা ৫) প্রায় তিনগুণ পরিমাণে দৈনন্দিন কার্যক্রম
১) আইনি সংস্কার
ক) আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ: এই আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এতে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা, সাক্ষীর সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, অন্তর্বর্তীকালীন আপিল, এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে।
খ) সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ: এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বতন্ত্র জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে মেধা, সুযোগের সমতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গ) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিচার বিভাগের নিজস্ব কর্তৃত্বে ন্যস্তকরণের বিধান করা হয়েছে।
ঘ) বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ: এর মাধ্যমে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে দালিলিক সাক্ষ্যভিত্তিক বিচার, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, মধ্যস্থতা, ভার্চুয়াল শুনানি এবং অনলাইন মামলা ব্যবস্থাপনার সুবিধা রাখা হয়েছে।
ঙ) মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়নের মাধ্যমে কমিশনের তদন্ত, ক্ষতিপূরণ আদায় ও নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং OPCAT বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠন করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো গণবিজ্ঞপ্তি ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সুযোগ্য কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
চ) গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, ২০২৫ জারি করে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত ক্ষমতা প্রদান, ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
ছ) জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা প্রদান এবং একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধে অংশগ্রহণের কারণে গণ অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার এবং নতুন মামলা দায়ের নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে।
জ) দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংশোধন: এই সংশোধন করে দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণের পরিবর্তে অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ, অনলাইনে সমন জারি এবং মূল মামলার অধীনেই রায় কার্যকর করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঝ) ফৌজদারি আইনে সংস্কার: ফৌজদারি আইন সংশোধনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করেছে। সেই সাথে অভিযুক্তের অধিকারের নিশ্চয়তা, জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ পরিহার, তদন্ত প্রক্রিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনা, মিথ্যা মামলার হয়রানি রোধ করাসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে।
ঞ) মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান সংযোজন: আইন সংশোধন করে নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের মামলার ক্ষেত্রে মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান করা হয়েছে। মধ্যস্থতা-চুক্তি আদালতের ডিক্রির সমতুল্য মর্যাদা পাচ্ছে। প্রতি জেলায় একজন বিচারকের স্থলে ৩ জন বিচারককে লিগ্যাল এইড অফিসে পদায়ন করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা (Pre-case Mediation) প্রক্রিয়া চালু করে ২০টি জেলায় এডিআর (ADR) ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের ফলে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে সফল নিষ্পত্তির গড় হার ৩৩৯.৮৬% বৃদ্ধি পেয়েছে ও যৌতুকের মামলা ৭৯.৭৪% হ্রাস পেয়েছে। বণ্টনের মামলা, অগ্রক্রয় সহ বিভিন্ন বিরোধের একদিনেই নিষ্পত্তি হচ্ছে।
ট) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন: এই সংশোধনীর মাধ্যমে তদন্ত ও বিচার শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তদন্ত সম্পন্নে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার জবাবদিহির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাক্ষীদের সুরক্ষা, শিশু ধর্ষণ মামলার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পুরুষ শিশু নিপীড়নকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ঠ) গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংস্কার: প্রবাসীদের জন্য ডাক ব্যালট প্রবর্তন, নির্বাচনী অপরাধ বিচারে বিচারকদের সমন্বয়ে অনুসন্ধান ও বিচার কমিটি গঠন এবং নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিচারিক ক্ষমতা জোরদার করা হয়েছে।
ড) সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথভাবে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে পূর্বের সাইবার নিরাপত্তা আইনের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো এবং এসবের অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
ঢ) পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালায় সংশোধনী: পূর্বে বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশি বৈধ পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। এখন বাংলাদেশি বৈধ পাসপোর্ট না থাকলেও, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিগণ তাদের পাসপোর্টে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্টিকার থাকলে বা জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারবেন। এতে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সম্পত্তি হস্তান্তরসহ নানা আইনি কাজ অনেক বেশি সহজ হবে।
ণ) বিবাহ নিবন্ধন বিধিমালা সংশোধন: বিবাহ নিবন্ধন বিধিমালা সংশোধন করে জেন্ডার বৈষম্যমূলক বিধান বাতিল করা হয়েছে। কাবিননামা ফরম সংশোধন করে তা সময় উপযোগী ও অধিকতর স্পষ্ট করা হয়েছে। অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন করার বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ সংস্কার কমিশন অধ্যাদেশ, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীসহ বিভিন্ন আইনে অধ্যাদেশ প্রণয়নে আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহকে সহযোগিতা প্রদান করেছে।
২) প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন
ক) জুডিশিয়াল সার্ভিসের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৩টি পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদসৃজনের ক্ষমতা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত করে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫’ এবং সার্ভিসের সদস্যদের সরকারের আইন ও বিচার বিভাগে পদায়নের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। পূর্বে পদ সৃজনের সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল বিধায় বিচারকের পদ সৃজনে বিলম্ব হতো এবং মামলা জট বাড়তো। এখন সুপ্রিম কোর্টের অধীন একটি বিশেষ কমিটিকে বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সঠিকভাবে পদোন্নতি নিশ্চিত করার জন্য পদোন্নতি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
খ) তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন: বিচারপ্রার্থী জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণে দেশের সকল আদালত প্রাঙ্গণে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মামলার সর্বশেষ অবস্থা, শুনানির তারিখ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি কমেছে।
গ) কেন্দ্রীয়ভাবে আদালতের কর্মচারী নিয়োগ: একটি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে দক্ষ কর্মচারী নিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ কার্যক্রম চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিধিসমূহ সংশোধন করা হয়েছে এবং সারা দেশের আদালতের মোট ২৭৩৩টি শূন্যপদে নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ঘ) দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম: অধস্তন আদালতের বিচারকদের সম্পত্তির হিসাব গ্রহণ এবং সংগৃহীত হিসাবের নথিসমূহ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়েছে। সাবরেজিস্ট্রারদের জন্য ব্যক্তিগত তথ্য বিবরণী তৈরি করা হয়েছে।
ঙ) প্রসিকিউশন মনিটরিং সেল: জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার উপর সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের প্রসিকিউশন কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
চ) বিচার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন: বিচার কার্যক্রম দ্রুততর করার লক্ষ্যে ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীদের অনলাইনে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের পত্রের আলোকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট Practice Directions জারি করেছে। এ ছাড়া ৮০% আদালতে ই-কজলিস্ট নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে, একে দ্রুততম সময়ে শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ছ) ই-ফ্যামিলি কোর্ট: আদালত ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুইটি পারিবারিক আদালতে ই-ফ্যামিলি কোর্টের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইনে মামলা দায়ের, হাজিরা ও শুনানি, কোর্ট ফি প্রদান, শুনানি এবং রেকর্ড সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। এই ডিজিটাল কাঠামো পারিবারিক আদালতের কার্যক্রম আধুনিক ও সহজলভ্য করেছে।
জ) অনলাইন বেইলবন্ড: ৯টি জেলায় ই-বেইল বন্ড কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে যার ফলে জামিন প্রাপ্তির পর পূর্বে ১৪টি ধাপকে কমিয়ে এক ধাপে নামিয়ে আনা হয়েছে।
ঝ) আইন মন্ত্রণালয়ে ডিজিটালাইজেশন: আইন ও বিচার বিভাগের ডি-নথির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি শতভাগে তা ছাড়া, এ মন্ত্রণালয়ের Attestation সেবাকে শতভাগ অনলাইন প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা হয়েছে।
ঞ) জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা: এই সময়কালে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়াও, জরুরি আইনগত সহায়তা, প্রবাসী নাগরিকদের সহায়তা প্রদান এবং পেশাদার মধ্যস্থতাকারী সৃষ্টির লক্ষ্যে সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিনা মূল্যে আইনি পরামর্শের জন্য সহজে মনে রাখার মতো নতুন ফোন নম্বর (১৬৬৯৯) এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ট) দেওয়ানি আদালতের পরিচিতি: দেওয়ানি বা সিভিল আদালত হওয়া সত্ত্বেও আদালতের নামের সাথে ‘সিভিল’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সহকারী’ শব্দটি থাকায় ‘সহকারী জজ আদালত’ ও ‘সিনিয়র সহকারী জজ আদালত’-এর স্বাধীনতা ও এখতিয়ার বিষয়ে বিচারপ্রার্থী ও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতো। বর্তমানে আইন সংশোধন করে আদালতের নাম পরিবর্তন করে ‘সিভিল জজ আদালত’ ও ‘সিনিয়র সিভিল জজ আদালত’ করা হয়েছে।
ঠ) দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথক্করণ এবং রেকর্ড সংখ্যক নতুন আদালত সৃজন
এই সময়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথক করা হয়েছে, যার ফলে এক বিচারককে একাধিক প্রকৃতির মামলার বিচার করতে হবে না। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমবে। এ সময়ে রেকর্ডসংখ্যক ১৬০৫টি নতুন আদালত সৃষ্টি হয়েছে।
ণ) নিবন্ধন অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন বিভাগের সংস্কার: রেজিস্ট্রেশন সেবার মানোন্নয়ন, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, এবং জনবান্ধব সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। নিবন্ধন অধিদপ্তর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরুর দ্বারপ্রান্তে। এ পদ্ধতি চালু হলে দাতা/বিক্রেতার বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাইপূর্বক রেকর্ডপত্র অনলাইনে ডিজিটাল বালামে সংরক্ষিত হবে। সূচিবহি ও দলিল অনলাইনে থাকবে। ভূমি অফিস থেকে এলটি নোটিশ এবং রেজিস্ট্রিকৃত দলিল অনলাইনে দেখা যাবে। ফলে জাল দলিলে নামজারি বন্ধ হবে।
৩। হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার কার্যক্রম
রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা: এ বিষয়ে জেলা পর্যায়ে গঠিত কমিটি এবং আইন ও বিচার বিভাগের পর্যালোচনার পর এ ধরনের ২৩,৮৬৬টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। সুচারুভাবে সকল ভুক্তভোগীকে এই সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এরূপ হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া সাইবার আইনের অধীনে ৪১০টি স্পিচ অফেনস সংক্রান্ত মামলা, এবং জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রায় সকল মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহারে সীমাহীন ভোগান্তি ও হয়রানি থেকে মুক্তি পেয়েছে কয়েক লক্ষ মানুষ।
৪) গণহত্যার বিচার সহায়তা: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংগঠিত গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ও প্রসিকিউটরদের নিয়োগ, তাদের সকল লজিস্টিক সহায়তা প্রদান, প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন ও প্রসিকিউশন কাজের তদারকির দায়িত্ব পালন করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এই আদালতের চারটি মামলার রায় হয়েছে, আরও কমপক্ষে ছয়টি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, গুম সহ বহু মামলার বিচার শুরু হয়েছে।
৫) দৈনন্দিন কার্যক্রম
এ সরকারের কার্যকালে মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে লক্ষণীয় গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দেড় বছরে মন্ত্রীপর্যায়ে নিষ্পত্তিকৃত নথির সংখ্যা ২২৮১ টি, বিগত সরকারের একই সময়ে ১২৩৫টি নথি নিষ্পত্তি হয়েছিল। গত দেড় বছরে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ অন্যান্য দপ্তরে ৫৭৮টি বিষয়ে আইনি মতামত প্রদান করা হয়েছে (গত সরকারের আমলে ২১০ টি)। আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রেকর্ড ১৫টি অংশীজন মতবিনিময় সভা আয়োজন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগ সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনগুলো, গুম-সংক্রান্ত অপরাধ তদন্ত কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো বিধিমালা ও প্রবিধানগুলোকে কোডিফাই করার কাজ শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে প্রণীত ১২৭টি অধ্যাদেশ ও একটি আদেশ নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগকৃত সকল আইন কর্মকর্তা পালিয়ে যাওয়ার কারণে গত দেড় বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক আইন কর্মকর্তাকে (প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার) নিয়োগ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগে ৪৮ জন বিচারপতি নিয়োগে সাচিবিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা হিসেবে আসিফ নজরুল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কি কাজ হয়েছে তার হিসাবও দেবেন বলে পোস্টে জানিয়েছেন।