হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

স্যুটকেস যত ছোট, কেনাকাটা তত বেশি! আসলেই কি সত্য, জেনে নিন

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

পর্যটকেরা অনেক সময় পণ্য কেনেন না; অভিজ্ঞতা কেনেন। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

ভ্রমণে বের হওয়ার আগে স্যুটকেস গোছানোর সময় কী কী সঙ্গে নিতে হবে, এ বিষয়ে প্রায় সবার একটি অদ্ভুত হিসাব থাকে। কিন্তু ফেরার সময় সেই হিসাব যায় উল্টে। যে স্যুটকেস যাওয়ার সময় বেশ ফাঁকা থাকে, ফেরার পথে সেটিতেই ঠাসাঠাসি করে জিনিসপত্র ঢোকানো হয়। নতুন জামাকাপড়, স্থানীয় খাবার, স্মারক, পরিবারের জন্য উপহার, নিজের জন্য ‘একটা ছোট্ট জিনিস’—সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ওঠে, এত কিছু কিনলাম কী করে?

মজার ব্যাপার হলো, এই কেনাকাটা সব সময় প্রয়োজনের হিসাব মেনে হয় না; বরং ভ্রমণের পরিবেশ, সময়ের চাপ, স্মৃতি ধরে রাখার ইচ্ছা, ‘এখানে আবার কবে আসব’ এই ভাবনা এবং আরও কিছু মানসিক অবস্থা মিলিয়ে তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের পর্যটক-মনস্তত্ত্ব।

‘এটা না কিনলে আফসোস হবে’

স্যুভেনির বা ভ্রমণ-স্মারক শুধু একটি বস্তু নয়; এগুলো অনেক সময় ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ‘প্রমাণ’ হিসেবে কাজ করে। ছবি: পেক্সেলস

ধরা যাক, কক্সবাজার থেকে ফেরার আগের সন্ধ্যা। হোটেলের ঘরে ব্যাগ গোছাতে গিয়ে দেখা গেল, জায়গা প্রায় নেই। অথচ বাজারে যাওয়ার পর চোখে পড়ল হাতে তৈরি একটি শোপিস। দাম খুব বেশি নয়। প্রয়োজনও নেই। কিন্তু মনে হলো, এটা তো কক্সবাজারের স্মৃতি হয়ে থাকবে! এই ‘স্মৃতি কেনা’ পর্যটকদের কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, স্যুভেনির বা ভ্রমণ-স্মারক শুধু একটি বস্তু নয়; এগুলো অনেক সময় ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ‘প্রমাণ’ হিসেবে কাজ করে। মানুষ বিশেষ মুহূর্তকে মনে রাখতে এবং সেই মুহূর্তের সঙ্গে বস্তুগতভাবে যুক্ত থাকতে স্মারক কেনে। স্মারক নিজের জন্য যেমন কেনা হয়, তেমনই পরিবার ও বন্ধুদের উপহার হিসেবেও কেনা হয়।

তাই ভ্রমণ শেষে একটি ছোট্ট পুতুল, চুম্বক, টি-শার্ট কিংবা স্থানীয় হস্তশিল্পের জিনিস হাতে তুলে নেওয়ার সময় ক্রেতা আসলে শুধু পণ্যটির দাম বিবেচনা করছেন না, তিনি ভাবছেন, ‘এই জিনিসটা দেখলেই আমি এই ভ্রমণের কথা মনে করতে পারব।’

ছোট স্যুটকেস কেন বড় সিদ্ধান্ত তৈরি করে

এখানেই তৈরি হয় মনস্তত্ত্বের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক—অভাব বা সীমাবদ্ধতার অনুভূতি।

সাধারণ অবস্থায় আমরা কোনো জিনিস দেখে বলতে পারি, ‘পরে কিনব।’ কিন্তু বিদেশে বা দূরের কোনো পর্যটন স্থানে গিয়ে সেই সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে ভ্রমণের শেষ দিনে মনে হয়, এখন না কিনলে আর কেনাই হবে না।

একটি গবেষণা আমাদের জানাচ্ছে, সময়ের স্বল্পতা পর্যটকদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে; বিশেষ করে বেশি ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পর্যটকদের ক্ষেত্রে সময় কমে আসা হঠাৎ কেনাকাটার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্যুটকেসের জায়গাও অনেকটা একই ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

‘জায়গা নেই’—তথ্যটি একদিকে কেনাকাটা বন্ধ করার সংকেত। অন্যদিকে এটি ‘শেষ সুযোগের অনুভূতি’ তৈরি করতে পারে। ফলে মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, ‘ভাবার সময় নেই। জিনিসটি কিনবই।’

‘আর তো আসব না’—এই যুক্তির জাদু

ভ্রমণে কেনাকাটার শক্তিশালী যুক্তিগুলোর একটি হলো দুর্লভতার অনুভূতি।

ঢাকার কোনো দোকানে যে ধরনের ব্যাগ পাওয়া যায়, সেটি হয়তো পর্যটন স্থানে দেখেও কিনবেন না। কিন্তু কোনো পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে স্থানীয় কারিগরের তৈরি ব্যাগ দেখলে সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে। কারণ, তখন পণ্যটির সঙ্গে যুক্ত হয় জায়গাটির পরিচয়।

২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পর্যটকদের স্যুভেনির কেনার সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পণ্যের কার্যকরী মূল্য ও সামাজিক মূল্য কেনার ইচ্ছাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তাই সেন্ট মার্টিনের কোনো স্থানীয় পণ্য, শ্রীমঙ্গলের চা, বান্দরবানের হস্তশিল্প কিংবা কক্সবাজারের সামুদ্রিক স্মারক—এসবের মূল্য ক্রেতার কাছে শুধু টাকার অঙ্কে মাপা হয় না, এর সঙ্গে যোগ হয় গল্প। ‘এটা আমি বান্দরবানের গহিন অঞ্চল থেকে এনেছি।’ এই একটি বাক্যই পণ্যটির সামাজিক মূল্য বাড়িয়ে দেয়।

নিজের জন্য একটি, পরিবারের জন্য আরেকটি

ভ্রমণের কেনাকাটা শুধু নিজের জন্য হয় না।

‘মায়ের জন্য একটা নিই।’

‘বন্ধুর জন্য এটাও নেওয়া যায়।’

‘অফিসে নিয়ে গেলে সবাইকে একটু দেওয়া যাবে।’

‘বাচ্চার জন্য কিছু না নিলে মন খারাপ করবে।’

এভাবে একটি কেনাকাটা খুব দ্রুত পাঁচটি কেনাকাটায় পরিণত হয়।

অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, পর্যটকের নিজের জন্য কেনা এবং অন্যের জন্য উপহার কেনার ক্ষেত্রে আলাদা মনস্তাত্ত্বিক বিবেচনা কাজ করে। স্যুভেনির কেনার সিদ্ধান্তে পূর্বের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা ও স্যুভেনির সম্পর্কে ব্যক্তির মনোভাবও ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ, ভ্রমণ শেষে স্যুটকেস ভারী হওয়ার পেছনে নিজের কেনাকাটার চেয়ে ‘অন্যদের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়া উচিত’—এই সামাজিক প্রত্যাশারও বড় ভূমিকা থাকতে পারে।

পর্যটক আসলে কী কিনছেন

পর্যটকেরা অনেক সময় পণ্য কেনেন না; অভিজ্ঞতা কেনেন। একটি ছোট্ট মাটির পাত্র। অন্য সময় হয়তো বাড়িতে এর বিশেষ প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটি কোনো ঐতিহাসিক জায়গার পাশের কোনো স্থানীয় কারিগরের কাছ থেকে কেনা হলে পাত্রটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় সেই জায়গা, সময়, মানুষ এবং ভ্রমণের স্মৃতি। কিছু পর্যটক এসব কারণেই সাধারণ পণ্যের চেয়ে স্যুভেনিরের জন্য বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত থাকেন।

ভ্রমণের শেষ দিন কেন সবচেয়ে বিপজ্জনক

ভ্রমণের শেষ দিনটি কেনাকাটার জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় পর্যটকদের হঠাৎ কেনাকাটা নিয়ে সময়ের স্বল্পতার প্রভাব পাওয়া গেছে। ভ্রমণ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসে, কিছু পর্যটকের ক্ষেত্রে দ্রুত ‘কিনে ফেলার’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

তাই শেষ দিনের বাজারে যে দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়—এক হাতে শপিং ব্যাগ, অন্য হাতে মোবাইল ফোন, মাথায় ফ্লাইটের সময়—তা নিছক ব্যস্ততা নয়। এটি আসলে সময়-সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উদাহরণমাত্র।

‘সস্তা’ মনে হওয়ার আরেক মনস্তত্ত্ব

ভ্রমণে আমরা অনেক সময় টাকার হিসাবও অন্যভাবে করি।

৩০০ টাকা দামের যে জিনিস বাড়িতে থাকলে হয়তো কিনতেন না, কিন্তু ভ্রমণের মোট বাজেট ১ লাখ টাকা হলে সেই ৩০০ টাকা তুলনামূলকভাবে খুব কম মনে হতে পারে। ফলে পছন্দের যেকোনো কিছুই সে সময় কিনে ফেলা যায়।

এর সঙ্গে যোগ হয়—‘এত দূর এসেছি, একটা জিনিস কিনতেই পারি।’

এভাবে ছোট ছোট খরচ আলাদাভাবে খুব বড় মনে না হলেও সব মিলিয়ে টাকার অঙ্কটা বেশ বড়ই দাঁড়ায়। আর স্যুটকেসে জায়গা থাকলে সেই অতিরিক্ত কেনাকাটা আরও সহজ হয়।

কিন্তু জায়গা একেবারে শেষ হয়ে গেলে আবার অন্য ধরনের সমস্যা তৈরি হয়—কোথায় রাখব?

তখন শুরু হয় স্যুটকেসের টেট্রিস খেলা।

জামার ফাঁকে চা, জুতার ভেতরে মোজা, তোয়ালের পাশে শোপিস—সবকিছু নতুন করে সাজাতে হয়। আর আশ্চর্যজনকভাবে, এই জায়গা করে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও অনেক সময় মানুষকে আরও একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়। সেটি হলো, ‘যেহেতু এত কিছু কিনেই ফেলেছি, আরেকটা নিলে কী এমন হবে!’

‘ছোট স্যুটকেস = বেশি কেনাকাটা’ কি বৈজ্ঞানিক সত্য

এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। ছোট স্যুটকেস বেশি কেনাকাটা করায়—এমন দাবির সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই; বরং গবেষণাগুলো পর্যটকের কেনাকাটার পেছনে সময়ের স্বল্পতা, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, স্মৃতি, উপহার, স্থানীয়তার অনুভূতি এবং পণ্যের মূল্যবোধের মতো নানা কারণ দেখিয়েছে।

বরং বলা যায়, স্যুটকেসের সীমিত জায়গা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সময়ও সীমিত, সুযোগও সীমিত, এই জায়গাটিও হয়তো আর ফিরে পাব না। আর সেই মুহূর্তে একটি সাধারণ পণ্য হয়ে ওঠে স্মৃতি।

শেষ পর্যন্ত স্যুটকেস ভারী হয় কেন

ভ্রমণ শেষে স্যুটকেস খুললে দেখা যায়, সেখানে শুধু কাপড় নেই; আছে একটি জায়গার গন্ধ, একটি বিকেলের স্মৃতি, বন্ধুর জন্য কেনা উপহার, মায়ের জন্য শাড়ি, সন্তানের খেলনা, স্থানীয় খাবার, নিজের জন্য কেনা অপ্রয়োজনীয় অথচ প্রিয় একটি জিনিস।

তাই ভ্রমণের স্যুটকেস আসলে একধরনের চলমান স্মৃতির বাক্স।

যে মানুষটি যাওয়ার সময় হিসাব করে পাঁচটি জামা নিয়েছিলেন, ফেরার সময় হয়তো তাঁর সঙ্গে থাকে পাঁচটি নতুন গল্প।

আর সেই গল্পগুলোর কিছু থাকে ছবিতে, কিছু মনে—আর কিছু থাকে স্যুটকেসের একেবারে নিচে চাপা পড়ে থাকা ছোট্ট একটি স্মারকে।

সূত্র

  • Wang, W. The influence of value perceptions on tourist souvenir purchase decisions, International Journal of Tourism Research, 2024.
  • To buy or not to buy? The effect of time scarcity and travel experience on tourists' impulse buying, Annals of Tourism Research, 2021.