ভ্রমণ মানে কেবলই নতুন কোনো জায়গা, পাহাড় বা সমুদ্র দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং ভ্রমণ হলো অচেনা মানুষ আর অজানা সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনের এক দুর্দান্ত সুযোগ। কিন্তু সমস্যা তখনই বেঁধে যায় যখন আপনি স্বভাবগতভাবে কিছুটা অন্তর্মুখী বা ‘ইন্ট্রোভার্ট’ হয়ে থাকেন। অনেকেই আছেন একা ঘুরতে ভীষণ ভালোবাসেন; কিন্তু অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই জড়তা কাজ করে। অচেনা জায়গায় অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা শুরু করবেন, এ চিন্তায় অনেকেই বিব্রতবোধ করেন। তবে একটু কৌশলী হলে এই মুখচোরা স্বভাব কাটিয়ে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন আড্ডার মধ্যমণি। আজকের আয়োজনে থাকছে একলা ভ্রমণে আড্ডা জমানোর সে রকমই কিছু টিপস।
থাকার জন্য হোস্টেল বা হোম-স্টে বেছে নিন
একা ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিলাসবহুল হোটেলের চেয়ে বরং ‘ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেল’ বা স্থানীয়দের হোম-স্টে অনেক বেশি কার্যকর। হোস্টেলগুলোতে সাধারণত কমন এরিয়া ও ক্যাফেটেরিয়া থাকে, যেখানে বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকেরা ভিড় করে থাকেন। রুমে নিজেকে বন্দী করে না রেখে হোস্টেলের ওয়াই-ফাই জোন বা লাউঞ্জে গিয়ে বসুন। এগুলোতে অন্যদের যাতায়াত বেশি থাকার ফলে নতুন কারও সঙ্গে কথা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়। হোস্টেলে বড় কোনো ডরমিটরিতে থাকলে পাশের বেডের মানুষটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রশ্ন হোক বর্ণনামূলক
কারও সঙ্গে কথা বলার সময় এমনভাবে প্রশ্ন করুন, যাতে তিনি বিস্তারিত উত্তর দিতে বাধ্য হন। যেমন কেবল ‘কেমন আছেন?’ জিজ্ঞাসা না করে ‘এ জায়গাটি আপনার কেমন লাগছে?’ বা ‘এখানকার কোন খাবারটি সবচেয়ে ভালো?’ তা জিজ্ঞাসা করুন। এ ধরনের প্রশ্ন কথোপকথনের পরিধি বাড়ায়। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করলে মানুষ সাধারণত খুব আগ্রহ নিয়েই উত্তর দেয়। আপনার গন্তব্য আর তাদের পরিকল্পনার মধ্যে মিল খুঁজে পেলে দেখবেন আড্ডা খুব ভালো জমে উঠবে।
স্থানীয় উৎসবে শামিল হন
যেখানেই বেড়াতে যান না কেন, সেখানকার স্থানীয় বাজার ও উৎসবে অবশ্যই যাবেন। অপরিচিত পর্যটকের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা অনেক ক্ষেত্রেই সহজ হয়। স্থানীয় দোকানদারদের কাছে কোনো জিনিসের ইতিহাস জানতে চাইলে বা কোনো ঠিকানার পথ জানতে চাইলে আড়ষ্টতা দ্রুত কেটে যায়। মানুষ যখন নিজের এলাকা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অন্যকে জানায়, তখন তাঁরা খুবই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আপনি নিজের জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেন।
ছোট উপহার বা স্ন্যাক্স সঙ্গে রাখুন
আলাপ জামানোর একটি প্রাচীন ও কার্যকর উপায় হলো খাবার ভাগ করে নেওয়া। আপনার ব্যাগে সব সময় চকলেট, চিপস বা নিজ এলাকার বিখ্যাত কোনো শুকনো খাবার রাখতে পারেন। দীর্ঘ ট্রেন বা বাস যাত্রায় পাশের সহযাত্রীর সঙ্গে এসব ভাগ করে নিলে দেখবেন আলাপ জমে উঠবে। তবে অবশ্যই মনে রাখবেন, অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার খাওয়ার সময় বা নিজের খাবার দেওয়ার সময় নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টি মাথায় রাখবেন।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার
বর্তমান যুগে অনেক অ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ আছে, যেখানে একলা ভ্রমণকারীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকেন। ঘুরতে যাওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে আপনার পরিকল্পনার কথা জানাতে পারেন। এতে করে গন্তব্যে পোঁছানোর আগেই আপনি কিছু ভার্চুয়াল বন্ধু পেয়ে যাবেন, যাঁদের সঙ্গে যদি গন্তব্যে পৌঁছে সরাসরি দেখা হয়, তখন দেখবেন যে কথা বলা খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া কাউকে ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ করাও আলাপ শুরু করার ক্ষেত্রে একটি চমৎকার ‘আইসব্রেকার’ হতে পারে।
মনে রাখবেন, কথা বলা মানে শুধুই অনর্গল বকবক করা নয়। বরং আপনার মার্জিত রুচি, বিনয়ী আচরণ ও সাহায্যের মানসিকতাই আপনাকে অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
সূত্র: হোস্টেল ওয়ার্ল্ড ও সাইকোলজি টুডে