সিলেটের জৈন্তাপুর বাজার থেকে কিছুদূর এগিয়ে সড়কের ডান দিকে কাঁচা সড়ক ধরে প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই শাপলা বিল। বর্তমান সময়ে পর্যটকদের জন্য বেশ আকর্ষণীয় জায়গা এই জলজ রূপকথার রাজ্য। শতসহস্র শাপলা ফুলের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল জলরাশিজুড়ে। সবুজ পাতার ফাঁকে অজস্র লাল ফুলের হাসি। অদূরে হাতছানি দিচ্ছে সবুজ নোয়ানো পাহাড়। বিলের পানিতে ভাসছে তারই ছায়া। ফুল আর পাহাড় মিলে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল বোনা সেখানে। যেন সবুজের ক্যানভাসে আঁকা লাল ফুলের জলছবি।
হাওরটির নাম ডিবির হাওর। অবস্থান সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায়। এই হাওর বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে। লাল শাপলার বিল নামেও পরিচিত। এখানে আছে ডিবি বিল, ইয়াম বিল, হরফকাট বিল ও কেন্দ্রী বিল। এই চারটি বিলকে একত্রে লাল শাপলার বিল বলা হয়। চারটি সংযুক্ত বিলের আয়তন ৯০০ একর।
এই হাওরের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে একটি রহস্যময় সমাধিসৌধ, যার ইতিহাস জৈন্তা রাজবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত। বলা হয়, এখানেই রয়েছে জৈন্তার রাজা বিজয় সিংহের সমাধি, যেটি প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো। হাওরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো এই স্থাপনা নিয়ে পর্যটকদের কৌতূহলের শেষ নেই; রয়েছে কথা, কাহিনি ও কিংবদন্তি। স্থাপনাটি দেখার জন্য নৌকা নিয়ে পৌঁছালাম সেখানে। সৌধটির ভেতরে একটু উঁকি দিতেই মাঝির সতর্ক উচ্চারণ—‘আর কাছে যাইবা না, নাইলে সকালে ঘুম থাকি উঠিয়া দেখবা সারা গায়ে বেদনা (ব্যথা) অইগেছে।’ মাঝির কথা কিছুক্ষণের জন্য হলেও শ্মশানে ভূত দেখার কল্পনায় আচ্ছন্ন করেছিল। ঘোর কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটি সম্পর্কে আর কিছু জানেন? বললেন, ‘আমরা মুরব্বিদের কাছ থাকি শুনছি, এটা জৈন্তার রাজা বিজয় সিংহের সমাধি। এই বিলেই রাজারে হত্যা করা অইছে। ইতা বহু আগের ঘটনা।’
এ ঘটনার সত্যতা পেলাম ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও জৈন্তা ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মো. খায়রুল ইসলামের কাছে। তিনিও জানালেন, জৈন্তা রাজ্যের রাজা বিজয় সিং বা কালু রাজার সমাধি এটি। রাজকন্যা কুড়ির অসম প্রেমের বলি রাজা বিজয় সিংহ। প্রাসাদ যড়যন্ত্রে এই বিলের পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে এবং সেখানেই সমাহিত করা হয়।
‘সিলেট গীতিকা’র ‘সোনা ধনের গীতে’ বিজয় সিংহের কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায় বলে জানালেন লেখক ও প্রকাশক সুফি সুফিয়ান। তিনি এ নিয়ে ‘জৈন্তেশ্বরী’ নামে একটি নাটকও লিখেছেন বলে জানালেন।
এডওয়ার্ড আলবার্ট গেট ‘আ হিস্টরি অব আসাম’ বইয়ে জৈন্তা রাজ্যের বর্ণনায় জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহকে বিজয় নারায়ণ বলে উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর লেখা ‘হযরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ নামের বইয়ে পাওয়া যায় বিজয় সিংহের কথা। এখানেও রাজাকে বিজয় নারায়ণ নামে উল্লেখ করে মুর্তাজা আলী লিখেছেন, ‘১৭৮২ সালে বিজয় নারায়ণ রাজা হন। এই সময় নরতিয়াদের দলইর (সর্দার) পুত্র লক্ষ্মী সিংহ অত্যন্ত প্রতাপশালী হন। তিনি প্রজাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে বিজয় নারায়ণকে কেন্দ্রী বিল হাওরে হত্যা করে ১৭৮৮ সালে সিংহাসন আরোহণ করেন।’
বলা হয়, শাপলা বিলের এই সমাধিমন্দির দ্বিতীয় রামসিংহ প্রতিষ্ঠা করেন। মোস্তাক আহমাদ দীনের লেখায় পাওয়া যায় বিজয় সিংহ এবং রাজবাড়ীর প্রেমকাহিনির কথা। শ্রীধর বানিয়ার লেখা ও রাজমোহন নাথ সংগৃহীত ‘সোনা ধনের গীত’ একসময়কার বিপুল জনপ্রিয় গীতিকা। আর তাতে লেখা আছে, মিথ্যা অভিযোগে প্রাণদণ্ডের আদেশ পাওয়া লক্ষ্মীকে পালানোর সুযোগ দেওয়ায় সোনাধন লস্করের বাবা খাধন লস্করকে রাজা বিজয় সিংহ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয় বিজয় সিংহকে।
সেই সোনা ধন লস্করের প্রাসাদও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কানাইঘাটের বড়চতুল গ্রামে। স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে প্রাচীন এই সমাধিসৌধ সংরক্ষণ করা অবশ্যই জরুরি। পাশাপাশি ইতিহাসের আরও গভীর তথ্য অনুসন্ধান করাও প্রয়োজন। তাহলে প্রকৃতি উপভোগের পাশাপাশি জৈন্তার প্রত্ন-পুরাকীর্তির রাজ্য সম্পর্কেও নানা কিছু জানার সুযোগ পাবেন পর্যটকেরা।