হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

ছুটিতে গিয়ে অফিসের কথা মনে পড়ে কেন, জেনে নিন মুক্তির উপায়

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

ছুটি মানেই অফিস থেকে দূরে থাকা। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

ছুটি মানেই অফিস থেকে দূরে থাকা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় উল্টো হয়ে দাঁড়ায়। পাহাড়ের সামনে ছবি তুলছেন, সমুদ্রের ঢেউ পায়ের কাছে এসে আছড়ে পড়ছে কিংবা হোটেলের বারান্দায় বসে সকালের কফিতে চুমুক দিচ্ছেন—হঠাৎ মনে হলো, ‘আচ্ছা, কালকের প্রতিবেদনটা কে শেষ করবে?’ এমনকি ছুটির মধ্যেও মনে হতে পারে, ‘একবার অফিসের গ্রুপটা দেখি...!’ সেই ‘একবার’ কখন যে আধা ঘণ্টায় পরিণত হয়, টেরই পাওয়া যায় না!

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্কের এই অদ্ভুত প্যাটার্নের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু বিজ্ঞানসম্মত কারণ রয়েছে:

জেইগারনিক ইফেক্ট

১৯২৭ সালে সোভিয়েত মনোবিজ্ঞানী ব্লুমা জেইগারনিক আবিষ্কার করেন, মানুষের মস্তিষ্ক শেষ হওয়া কাজের চেয়ে অসমাপ্ত কাজকে বেশি মনে রাখে। অফিসের অসমাপ্ত প্রজেক্টগুলো আপনার মস্তিষ্কে মেমরি লিক করে রেখে দেয়। আপনি সৈকতে থাকলেও ব্রেইন ভেতরে-ভেতরে অসমাপ্ত টু-ডু লিস্ট প্রসেস করতে থাকে।

কাজ থেকে মানসিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে কম ক্লান্তি, ভালো ঘুম, বেশি জীবনসন্তুষ্টি ও উন্নত মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

অ্যাড্রেনালিন উইথড্রয়াল বা লেজার সিনড্রোম

প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চড়া স্ট্রেস হরমোনে অভ্যস্ত মস্তিষ্ক যখন হঠাৎ ছুটিতে গিয়ে একদম শান্ত পরিবেশ পায়, তখন সে দ্বিধায় পড়ে যায়। নিউরোসায়েন্স বলে, অভ্যস্ত উদ্দীপনা অর্থাৎ কাজের চাপ না পেয়ে মস্তিষ্ক নিজেই অফিসের চিন্তা তৈরি করে সেই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টায় থাকে।

ফ্যান্টম ভাইব্রেশন ও অভ্যাস

সাইকোলজিস্ট ক্রিস বেইলির মতে, আধুনিক মানুষের মস্তিষ্ক সারা দিন ডোপামিন স্পাইকের পেছনে ছোটে। অফিসে প্রতি ১০ মিনিটে মেইল বা মেসেজ নোটিফিকেশন চেক করার যে কন্ডিশনিং তৈরি হয়, শান্ত দ্বীপে বসেও হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে পকেটের দিকে যায় ‘ফ্যান্টম নোটিফিকেশন’ দেখার আশায়।

কাজের সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের একটি অভ্যাসগত সংযোগ তৈরি হয়। প্রতিদিন একই সময়ে অফিসে যাওয়া, নির্দিষ্ট কাজ করা, বারবার ই-মেইল দেখা, বার্তা পাওয়া, সমস্যার সমাধান করা—এসবের ফলে কাজের চিন্তা আমাদের দৈনন্দিন মানসিক জীবনের একটি অংশ হয়ে ওঠে। তাই অফিস থেকে শারীরিক দূরত্ব তৈরি করলেই মানসিক দূরত্ব তৈরি হয় না।

গবেষক সাবিনে সোনটাগ ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি কাজের চাপ এবং কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে দুর্বল সীমারেখা অবসর সময়ে কাজ থেকে মানসিক বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে দিতে পারে।

কাজটা পড়ে আছে—এই চিন্তাই বিপদ

ছুটিতে গিয়েও অফিসের কথা মনে পড়ার আরেকটি কারণ হলো অসমাপ্ত কাজ।

মানুষের মস্তিষ্ক অসমাপ্ত কাজ সহজে ছেড়ে দিতে চায় না। ফলে কোনো কাজ শেষ না করে ছুটিতে গেলে সেটি যেন মাথার ভেতর একটি খোলা জানালার মতো থেকে যায়।

স্মার্টফোন এই সমস্যাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। আগে অফিস থেকে ছুটি মানে সত্যিই অফিস থেকে দূরে থাকা। এখন আমরা অফিস পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। একটি বার্তা, একটি ই-মেইল বা একটি ফোনকল মুহূর্তেই আপনাকে আবার কর্মজীবনের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অবসর সময়ে কাজের বার্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানসিকভাবে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

শুধু দায়িত্ববোধ নয়, অভ্যাসও আছে

আপনি হয়তো জানেন, ছুটিতে আপনার কোনো কাজ নেই। তারপরও প্রতি ১০ মিনিটে ফোন হাতে নিয়ে দেখছেন—নতুন কোনো বার্তা এসেছে কি না।

কারণ শুধু দায়িত্ববোধ নয়, অভ্যাসও আমাদের চালিত করে।

কাজের সময় ফোনে বারবার বার্তা আসা, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেওয়া, নতুন কাজের নির্দেশ পাওয়া—এসব আচরণ ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। ছুটির দিনেও তাই ফোন হাতে নিলেই মস্তিষ্ক যেন পুরোনো কর্মজীবনের দরজা খুলে ফেলে।

আমি না থাকলে অফিস চলবে তো?

অফিসের কথা মনে পড়ার পেছনে শুধু চাপ নয়, নিজের কাজের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা বা দক্ষতাও ভূমিকা রাখতে পারে।

কেউ কেউ নিজের পেশাকে নিজের পরিচয়ের একটি বড় অংশ হিসেবে দেখেন। এই মানসিকতা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন দায়িত্ববোধ ছুটির সময়ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নিতে দেয় না।

অফিসের কথা মনে পড়া সব সময় খারাপ নয়

ছুটিতে কাজের কথা মনে পড়লেই সেটিকে সমস্যা বলা যাবে না। কখনো কাজের কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। এমনকি ইতিবাচকভাবেও কাজের কথা ভাবা যেতে পারে। ২০২০ সালের দুটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা যায়, কাজ নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবা এবং কাজ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন—দুই ধরনের কৌশলই মানুষের নেতিবাচক আবেগ কমাতে পারে।

অর্থাৎ, ছুটিতে বসে হঠাৎ মনে হলো, ‘দারুণ একটা ভাবনা মাথায় এসেছে’—এটা সমস্যা নয়।

সমস্যা হলো যখন আপনি সমুদ্রের ঢেউ → অফিসের চিন্তা → রেস্তোরাঁর খাবার → অফিসের ই-মেইল → পরিবারের আড্ডা → আগামী সপ্তাহের সভা → ঘুম → কাল অফিসে গিয়ে কীভাবে কাজটা করব—এ রকম একটা চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। তখন বুঝতে হবে, শরীর ছুটিতে থাকলেও মস্তিষ্ক এখনো কর্মদিবসে আটকে আছে।

ছুটি তাহলে আসলে কতটা বিশ্রাম দেয়

২০১৬ সালে ৭৭৭ জন মার্কিন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা ছুটিতে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পেরেছেন, স্বস্তি পেয়েছেন এবং নিজের সময় ও কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনুভব করেছেন, তাঁদের ছুটির অভিজ্ঞতা ও সামগ্রিক জীবনসন্তুষ্টি বেশি ছিল।

অন্যদিকে, ২০১৬ সালের একটি বিশ্লেষণে ৩৮ হাজারের বেশি কর্মীর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাজ থেকে মানসিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে কম ক্লান্তি, ভালো ঘুম, বেশি জীবনসন্তুষ্টি ও উন্নত মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ, ছুটি শুধু অফিসে না যাওয়ার নাম নয়; ছুটি হলো কিছু সময়ের জন্য অফিসকে মাথা থেকে নামিয়ে রাখারও নাম।

ছুটিতে অফিস থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন কীভাবে

  • ছুটিতে যাওয়ার আগে অসমাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন।
  • সহকর্মীদের জানিয়ে দিন, কোন কাজ কে দেখবেন।
  • জরুরি যোগাযোগের সীমা ঠিক করে দিন।
  • ছুটির সময় অফিসের বার্তা দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে মোবাইল ফোন থেকে দূরত্ব রাখুন।

গবেষণা বলছে, কাজ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি করা কর্মীদের নিজেদের পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ছুটিতে গিয়ে যদি মনে হয়, অফিসে এখন কী হচ্ছে?—তাহলে একটু হাসুন। নিজেকে মনে করিয়ে দিন, অফিস একটি প্রতিষ্ঠান; আপনার মস্তিষ্ক তার শাখা কার্যালয় নয়। তারপর সমুদ্র দেখুন। পাহাড় দেখুন। পরিবারের সঙ্গে গল্প করুন। ঘুমান। কিংবা কিছুই করবেন না।

কারণ, ছুটির সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত এটাই—কিছুদিনের জন্য কাজ না করা এবং কাজ না করার অপরাধবোধ থেকেও ছুটি নেওয়া।

তথ্যসূত্র

  • Journal of Vocational Behavior, 2010.
  • Tourism Management, 2016.
  • Frontiers in Psychology, 2020.
  • Sleep Epidemiology, 2024.