নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়। মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠেছিল এই দ্বীপ। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপ খ্রিষ্টপূর্ব ১৫ অব্দের দিকে প্রথম মানুষের নজরে আসে। সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃতির ভাঙাগড়ার খেলায় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এই দ্বীপের মানচিত্র। তবে বলে রাখা ভালো, হাতিয়া বেশ কয়েকটি উপকূলীয় দ্বীপ নিয়ে তৈরি হলেও এর প্রধান অংশ হাতিয়া সদর ও নিঝুম দ্বীপ।
কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে রাত সাড়ে ১১টায় যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা হাতিয়ার উদ্দেশে। প্রথম গন্তব্য চর ঈশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ঘাট। এরপর সেখান থেকে হাতিয়া। চেয়ারম্যান ঘাট একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং স্থানীয় ইলিশ-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকে হাতিয়ায় যাওয়ার জন্য সি-ট্রাক, ট্রলার ও স্পিডবোট পাওয়া যায়।
চেয়ারম্যান ঘাটে পৌঁছে সি-ট্রাকে চড়ে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে নলচিরা ঘাট। সেখান থেকে টমটমের আদলে স্থানীয়ভাবে তৈরি সিএনজিচালিত গাড়িতে চড়ে আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরের ওছখালী বাজার। সেখান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীতীরের কমলা দিঘিতে যখন পৌঁছাই, তখন বেলা বেশ চড়ে গেছে। এ দিঘি হাতিয়ার অন্যতম দর্শনীয় জায়গা। দিঘির পাশে কেওড়া বন, সুবিস্তৃত সবুজ মাঠ এবং মেঘনা নদীর নীল জলরাশি মিলেমিশে একাকার। সে এক অপার্থিব দৃশ্য! এসব দেখে ঘুরেফিরে বিকেলে তমরুদ্দিন লঞ্চঘাটে পৌঁছাই আমরা। এরপর সেখান থেকে সেদিনের সূর্যকে বিদায় জানালাম। আমাদের পরের গন্তব্য হলো নিঝুম দ্বীপ, যাকে বলা হয় হাতিয়ার অলংকার।
২০০১ সালের ৮ এপ্রিল এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নোনাপানি বেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ কেওড়াগাছের অভয়ারণ্য। সুন্দরবনের পরে এই দ্বীপকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলে অনেকে মনে করেন। এখানে নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে অবাধে ঘুরে বেড়ায় বন্য প্রাণী। এ ছাড়া শীতকালে আসে অতিথি পাখি। বিশাল সমুদ্রসৈকত, নরম বালু, মিঠা ও নোনাপানির মিশ্রণ এবং নীরব, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ যে কারও ভালো লাগবে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক সম্পদ আর অপার সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ এই দ্বীপ। আয়তনে বড় না হলেও প্রকৃতি যেন তার নিজ হাতে সাজিয়েছে এই দ্বীপকে। নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দাদের মূল জীবিকা মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ।
এখান থেকে যেতে হবে উছখালী। এরপর সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মোক্তারিয়া ঘাট। এটি জাহাজমারা থেকে নিঝুম দ্বীপে যাতায়াতের অন্যতম ঘাট। পরে এখান থেকে ট্রলারে নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলা ঘাটে যেতে হবে। এই ঘাট থেকে নামার বাজারের দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে হয় মোটরসাইকেল অথবা অটোরিকশায় চড়ে। নামার বাজার থেকে হেঁটে সৈকতে পৌঁছানো যায় ১০ মিনিটে। এটি নিঝুম দ্বীপের অংশ।
এখানে ট্রলার রিজার্ভ করে চৌধুরী খাল দিয়ে ম্যানগ্রোভ বনে যাওয়া যায় হরিণ দেখতে। নিঝুম দ্বীপের মতো দেশের অন্য কোথাও এত চিত্রা হরিণ দেখা যায় না। বলা হয়, এটি দেশের একমাত্র দ্বীপ, যেখানে মানুষের চেয়ে হরিণ বেশি। এই দ্বীপের বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে পলিমাটির চর। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়।
সাগর, হরিণ আর প্রকৃতি ছাড়া নিঝুম দ্বীপের আকর্ষণ হলো খাবার। বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, মোটা চালের ভাত, মাংস, রুটি, মহিষের দই পাওয়া যায় এখানে। শীতকালে খেজুরের রস এবং গুড়ের জন্য নিঝুম দ্বীপ বিখ্যাত। সাধারণত অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত খেজুরের রস পাওয়া যায়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন হাতিয়ার উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে যায়।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে শুক্র ও রোববার বাদে একটি জাহাজ হাতিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তবে সড়কপথে যেতে চাইলে ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে এসি বা নন-এসি বাসে নোয়াখালীর সোনাপুরে যেতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে সুবর্ণচর হয়ে চেয়ারম্যান ঘাট। সেই ঘাট থেকে সি-ট্রাক, স্পিডবোট বা ট্রলারে চড়ে হাতিয়ায় যাওয়া যায়। এ ছাড়া কক্সবাজার থেকে প্রতিদিন রাতে একটি এসি বাস চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত যায়।