জলবায়ু পরিবর্তন ও পর্যটন
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা দিন দিন রেকর্ড ভাঙছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের ভ্রমণ ও পর্যটনশিল্পে। তাই বলে কি ভ্রমণপিপাসুরা ঘরে বসে থাকবেন? তীব্র গরম, আর্দ্রতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আবহাওয়া থেকে বাঁচতে পর্যটকেরা এখন বেছে নিচ্ছেন ভ্রমণের নতুন কৌশল। কী সেসব কৌশল?
গরমের ছুটিতে পর্যটকেরা সমুদ্রসৈকতে যেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বা মনোরম আবহাওয়াযুক্ত জায়গায় ভ্রমণ করার এই নতুন প্রবণতাকে বলা হচ্ছে কুলকেশন। পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্যের মধ্যে আছে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশের দালি ও লিজিয়াংয়ের মতো জায়গা। এ ছাড়া ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান, নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার মতো জায়গাগুলোতে পর্যটকদের ভিড় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কিছু এলাকা পর্যটনে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। মঙ্গোলিয়ায় এ বছরের প্রথমার্ধে পর্যটকের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট মৌসুমে তাসমানিয়ায় রেকর্ড আড়াই লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন।
ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, এশিয়া মহাদেশ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। জাপানে রেকর্ড পর্যটক আসার পাশাপাশি তাপমাত্রা ১০৭ দশমিক ২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছে রেকর্ড গড়েছে। চরম গরমের দিনের জন্য জাপান একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘কোকুশো-বি’ বা নিষ্ঠুর গরমের দিন। ফ্রান্সে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার হিট ডোম তৈরি হওয়ায় প্যারিস কর্তৃপক্ষ পানিশূন্যতা ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মদ বিক্রি নিষিদ্ধ করেছিল। স্পেন ও যুক্তরাজ্যেও চরম গরমে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সময়সূচি ছোট করতে হয়েছে।
ভ্রমণ সংস্থাগুলো এখন দিনের বেলায় প্রখর রোদে পর্যটকদের বাইরে না পাঠিয়ে সকালের দিকে অথবা সন্ধ্যার পর ট্রিপগুলো শিডিউল করছে। অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম গেট ইয়োর গাইডের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর কার্যক্রম বা ট্রিপ বুকিং সামগ্রিকভাবে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে এশিয়ার বাজারে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি—৭০ শতাংশ। রাত্রিকালীন এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে কিয়োটোর ফুশিমি ইনারি মন্দিরে নৈশ ভ্রমণ, থাইল্যান্ডের মেকং নদীতে সূর্যাস্তকালীন বোট ট্যুর এবং রাতের নাইট মার্কেট ঘুরে দেখা।
জলবায়ু পরিবর্তন কেবল গরম বাড়ায়নি, এটি ঋতু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা এবং টাইফুনের ধরন বদলে দিয়েছে। ফলে নেপালের মতো পাহাড়ি অঞ্চলের হোটেলগুলোকে সারা বছর ধরে আবহাওয়া-সম্পর্কিত ঝুঁকি পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আরও একটি ভ্রমণ ট্রেন্ড বাড়ছে। যাকে বলা হয় লাস্ট চান্স ট্যুরিজম বা হারিয়ে যাওয়ার আগে দেখা। অনেক পর্যটক মালদ্বীপ বা গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের মতো জায়গাগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই দ্রুত ঘুরে আসতে চাইছেন। পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়, এটি পর্যটনশিল্পের এক কঠোর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। পর্যটকেরা এখন আর শুধু বিনোদন নয়, বরং জলবায়ুর সামঞ্জস্যতা এবং নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সূত্র: সিএনএন