হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

সৃষ্টিছাড়া: সৃষ্টি দেখতে

মইনুল হাসান, ফ্রান্স  

অবশেষে এ বছর মিনমিনে উচ্চারণে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল, ‘সমাপ্ত’। এই একটি শব্দ শোনার জন্য পৃথিবীর মানুষদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৪৪ বছর। খুব জাঁকজমক করে উদ্বোধনও করা হলো। অথচ আজও শেষ হয়নি এর নির্মাণকাজ। যাঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল, সেই বিশ্বখ্যাত স্থপতি আন্তোনি গাউদিও গত হয়েছেন; তা-ও এক শতাব্দী হয়ে গেছে। এই অদ্ভুত স্থাপনার নাম সাগ্রাডা ফামিলিয়া অর্থাৎ পবিত্র পরিবার। স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, কাতালোনিয়া অঞ্চলের রাজধানী বার্সেলোনাতে অবস্থিত পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ মানুষের এই কালজয়ী কীর্তি।

আমাদের আবাস ফ্রান্সের তুলুজে। এবার গরমের ছুটিতে ইচ্ছা হলো কয়েকটা দিন বার্সেলোনায় কাটাব। এর দুটো কারণ, প্রথমত সাগ্রাডা ফামিলিয়াকে নতুন রূপে দেখার ইচ্ছা। দ্বিতীয়ত লন্ডন থেকে স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে আসবে আমার ছোট ভাই। প্রায় তিন দশক পরে দেখা হবে—রক্তের টান। মনের বাসনা স্ত্রীকে জানাতেই তিনি উৎফুল্ল হলেন। ভ্রমণ থেকে শুরু করে আমাদের দুজনের থাকার ব্যবস্থা—সবকিছুই অনলাইনে করে ফেললেন।

বার্সেলোনা স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর। শহরটি ফ্রান্সের সীমান্তের কাছাকাছি এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের কারণে প্রাচীনকাল থেকে রাজনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প, সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একটি আধুনিক নগরীতে যা যা থাকার, তার কোনো কিছুরই অভাব নেই এখানে। প্রশস্ত রাস্তার দুধারে শতাব্দী পুরোনো ভবনগুলোর ভেতরের দিক নতুন করে সাজানো হলেও বাইরের পুরোনো কাঠামো ও নকশার পরিবর্তন করা যাবে না এবং ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। ফলে নগরীর পুরোনো আর নতুন অংশ মিলে অতীত-বর্তমান পাশাপাশি।

জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বার্সেলোনায় পর্যটকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এ সময়টাতে শহর থেকে একটু দূরে তিন তারকা হোটেল হ্যাম্পটন বাই হিলটন আমাদের দুজনের রাজকীয় প্রাতরাশসহ প্রতি রাতের জন্য ১৪০ ইউরো গুনতে হয়েছে। ছোট ভাই, তার স্ত্রী এবং তাদের কন্যা নগরীর অদূরে পাঁচ রাত থাকার জন্য রান্নার সুবিধাসহ বেশ চমৎকার একটি ফ্ল্যাট নিয়েছে। পুরো পাঁচ রাতের জন্য ভাড়া পড়েছে ৭০০ ইউরো।

ট্রাম ও বাসের সুব্যবস্থায় নগরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় খুব সহজে চলে যাওয়া যায়। ট্যাক্সির ওপরও বেশ আস্থা রাখা যায়। তবে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে একটু সতর্ক হওয়াই ভালো; তা না হলে খাবারের মান ও দামের কারণে খানিকটা হতাশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুই হাজার বছরের পুরোনো নগরী বার্সেলোনায় দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এগুলোর মধ্যে থেকে প্রধানত সাগ্রাডা ফামিলিয়া, কাসা বাত্লো, কাসা মিলা, পার্ক গুয়েল, গথিক কোয়ার্টার, লা রাম্বলা, মন্তজুইক পাহাড়-দুর্গ, জাদুঘর ও মনোরম দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত ক্যাম্প নউ-এফসি বার্সেলোনার বিখ্যাত স্টেডিয়াম, পিকাসো মিউজিয়াম আর সমুদ্রের তীর ঘেঁষে এগারো হাজার জলজ প্রাণী বুকে নিয়ে আছে এক বিশাল অ্যাকুয়ারিয়াম।

সাগ্রাডা ফামিলিয়া বা পবিত্র পরিবার

লেখার শুরুতে এই অতি নান্দনিক এবং অনন্য স্থাপনার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। নগরীর আইকন এই ক্যাথেড্রাল। খেয়ালি স্থপতি আন্তোনি গাউদি প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এর নকশা করেন এবং ১৮৮২ সালে এই স্থাপনার কাজ শুরু করেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি। তিনি সবকিছু ভুলে তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলোর সবটুকু উৎসর্গ করেছিলেন এই বিস্ময়কর স্থাপনার কাজে।

মানুষের সাধ্যের সীমা অতিক্রম করা মানুষ ছিলেন গাউদি। তিনি গথিক ও আর্ট নুভো শৈলী, জ্যামিতি, প্রকৃতি এবং ধর্মীয় প্রতীককে এমন এক অনন্য উপায়ে সমন্বয় করেছিলেন, যার তুলনা মেলা ভার। ১৯২৬ সালের ৭ জুন ট্রামের ধাক্কায় গাউদি গুরুতর আহত হন। তাঁর পরনে ছিল অতি সাধারণ পোশাক, ফলে সবাই তাঁকে ভবঘুরে একজন ভিক্ষুক বলে ভুল করেন। তিন দিন পরে, ১০ জুন তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর, তাঁর এই অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণতা দিতে সর্বশেষ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েও বিশ্বের বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞকে হিমশিম খেতে হয়েছে। অবশেষে কর্তৃপক্ষ অনেকটা অনিচ্ছায় এই অনন্য স্থাপনার নির্মাণকাজের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ স্থাপনাটি দেখতে আসেন। এককথায়, বার্সেলোনার প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে এই বিস্ময়কর স্থাপনার মধ্যে—যার শুরু আছে, শেষ নেই।

কাসা বাত্লো, কাসা মিলা এবং পার্ক গুয়েল

বার্সেলোনাকে গাউদির নগরী বললে মোটেই বাহুল্য হবে না। এই নগরীতে তাঁর অনুপম সৃষ্টিকর্ম দৃষ্টি কাড়বে। নগরের প্রাণকেন্দ্র প্লাসা দ্য কাতালোনিয়ার বিশাল চত্বরে পর্যটকেরা ভিড় করেন। এখানে এলে এই জনপদের ধুকপুকানি অনুভব করা যায়। শৌখিন শিল্পীরা নেচে-য়ে মাতিয়ে রাখেন দর্শনার্থীদের। শহুরে পাখিরাও মানুষের সঙ্গে ভিড় জমায় এখানে। কাছেই লা রাম্বলার ছায়াঘেরা প্রশস্ত সড়ক ধরে হেঁটে গেলে চোখে পড়বে নানা দেশের পথশিল্পীদের। এখানকার প্রাণোচ্ছলতার ছোঁয়া মনকে আনন্দে ভাসিয়ে দেবে, মনে হবে আপনি আনন্দপুরীতে ভ্রমণে এসেছেন।

একটু দূরেই চোখে পড়বে গাউদির আরেক সৃষ্টি কাসা বাত্লো এবং কাসা মিলা। এর বাঁকানো ছাদ দেখে মনে হবে অতিকায় ডাইনোসরের আঁশযুক্ত পিঠ। ঢেউখেলানো দেয়াল ও হাড়ের মতো বারান্দা দেখে মনে হবে প্রাগৈতিহাসিক কোনো প্রাণী পথ হারিয়ে আধুনিক নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছে।

পার্ক গুয়েলে পা রাখলে অনুভব করা যায়, মানুষের কল্পনাশক্তির ব্যাপ্তি কতটা হতে পারে। মোজাইকের সালামান্দার, বিচিত্র প্রাণী, বাঁকানো বেঞ্চ—গাউদির এসব কালজয়ী কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হতেই হয়। গতানুগতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর অনন্য স্থাপত্যশৈলী তাঁকে অন্য সব স্থপতির থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

বিকেলে ভূমধ্যসাগরের তীরের হালকা ঠান্ডা বাতাস ক্লান্তি দূর করে দেয়। সমুদ্রসৈকতে গাংচিলেরা বেশ নির্ভয়, পায়ের কাছে ঘুরে বেড়ায়। ইচ্ছা হলে আকাশে পাখা মেলে, কিংবা নিজেকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়।

৩৩ ইউরো দিয়ে একবার টিকিট কিনলে সিটি ট্যুর বাসে আরাম করে বসে পুরো শহর ঘুরে ঘুরে দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা যায়। ইচ্ছা হলে নেমে যাওয়া যায় এবং ঘুরেফিরে আবার বাসে চড়া যায়। পুরো ২৪ ঘণ্টা এই টিকিট কাজে লাগানো যায়। ঘরে ফেরার দিন মনে হলো, অনেক কিছু অদেখা রয়ে গেল। মনকে প্রবোধ দিই, একদিন আবারও ফিরে আসব গাউদির নগরে, তাঁর সৃষ্টিছাড়া সৃষ্টি দেখতে।

১. কাসা বাত্লোর ঢেউখেলানো দেয়াল এবং হাড়ের মতো বারান্দা দেখে মনে হবে, প্রাগৈতিহাসিক কোনো প্রাণী নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছে। ২. সাগ্রাডা ফামিলিয়া বা পবিত্র পরিবার—খেয়ালি স্থপতি আন্তোনি গাউদির কালজয়ী সৃষ্টি। ৩. বিকেলে ভূমধ্যসাগরের তীরের হালকা ঠান্ডা বাতাস ক্লান্তি দূর করে দেয়। ৪. ‘সিটি ট্যুর’ বাসে বসে পুরো শহর ঘুরে ঘুরে দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা যায়। ৫ নগরের প্রাণকেন্দ্র প্লাসা দ্য কাতালোনিয়ার। শৌখিন শিল্পীরা নেচে-গেয়ে মাতিয়ে রাখেন দর্শনার্থীদের। ছবি: লেখক