আমি ভ্রমণ করছি সেই ছোটবেলা থেকে। ভ্রমণ করতে আমার বেজায় ভালো লাগে; অনেকটা ‘পাগলা ভাত খাবি? হাত ধোবো কোথায়!’ টাইপ। আমার স্বামী, বিয়ের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বক্তব্য দিতে যান। তাঁর পেপার রেডি করার আগেই আমার সুটকেস গোছানো হয়ে যায়। তো, এমন সব ভ্রমণে আনন্দের সঙ্গে নানা রকম সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়। আজ বলব তারই দু-চারটে গল্প।
বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকে, আমরা যাচ্ছিলাম মাদ্রাজ বা বর্তমান চেন্নাইয়ে। তখনো ভিডিওতে হিন্দি সিনেমা দেখা তেমন চালু হয়নি। তাই আমার স্বামী মনে করতেন, বাংলা কথার ল্যাজে ‘হ্যায়’ শব্দটা লাগিয়ে দিলেই হিন্দি হয়ে যাবে। তখন তো আর প্লেনে চড়বার আওকাত ছিল না। তাই, কলকাতা থেকে করমণ্ডল এক্সপ্রেস ট্রেনে করে চেন্নাই যাব। কলকাতার ফেয়ারলি প্যালেসে তখন বিদেশিদের জন্য আলাদাভাবে টিকিট বিক্রি হতো। তো, ফেয়ারলি প্যালেসের সামনে একটি লোক মৃদু স্বরে বলছেন, ‘কালকা, কালকা, কালকা...’ আমার স্বামী তাড়াতাড়ি তাঁর কাছে গিয়ে আরও নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘পরশু কা হ্যায়!’ আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে আমার স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কোথায় যাবে?’
‘কেন মাদ্রাজে যাব। আগামীকাল তো এখানে থাকব, তাই জানতে চাচ্ছিলাম পরশুর টিকিট আছে কি না!’ আমি তাঁকে আরও ফিসফিস করে বললাম, ‘লোকটা কালকা মেলের টিকিট বিক্রি করছে। কালকা মেল দিল্লি যায়, মাদ্রাজে নয়!’ আমার স্বামী অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। স্ত্রী বেশি বুদ্ধিমান হলে সব স্বামীই হন, ও আমি আর গায়ে মাখি না। তারপর আমরা অফিসের ভেতরে গিয়ে সুস্থমতো করমণ্ডল এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কাটলাম। আমি তাকে পইপই করে বলে দিলাম, ‘দেখো, আমি হিন্দি লিখতে, পড়তে আর বলতেও জানি। তাই কিছু বলার আগে আমাকে বলতে বোলো।’ তিনি যথারীতি গম্ভীর হয়ে গেলেন।
করমণ্ডল এক্সপ্রেস চলছে দারুণভাবে। জানালার পাশে বসে নানা দৃশ্য দেখতে দেখতে চলেছি। ট্রেন বেশ খানিকটা সময়ের জন্য থামল ভুবনেশ্বর স্টেশনে। স্টেশনে এক ফেরিওয়ালা ছোট একটা ঝুড়িতে লাল শালু দিয়ে ঢাকা ফল নিয়ে সুরেলা গলায় ডাক দিচ্ছেন ‘আ...ম...রুদ’। আমার স্বামী ‘আম’টুকু শুনেই তাঁকে ডেকে ফেললেন, ‘এ ভাইয়া ইদিকে আও! কত করকে?’ ‘দো রুপিয়া পিস!’ তাঁর চোখে আলো জ্বলে উঠল, তিনি আম খেতে বড়ই পছন্দ করেন। খুশির চোটে বললেন, ‘দো ঠো দাও!’ আমি ততক্ষণে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে ফেলেছি। আমাকে হাসতে দেখলে খেপে যাবেন অবশ্যই। তিনি পকেট থেকে টাকা বের করতে করতেই ফলওয়ালা দ্রুত হাতে দুটো ডাঁশা পেয়ারা কেটে নুন-মরিচ মাখিয়ে কাগজে মুড়িয়ে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন। এবং আরও দ্রুত চলেও গেলেন। তিনি অত্যন্ত অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই ব্যাটা বাটপার আমারে আম কয়ে পিয়ারা দিল ক্যান!’ আমি বললাম, ‘ও আম বলেনি, আমরুদ বলেছে। আমরুদ মানে পেয়ারা।’ পেয়ারার স্বাদটা খুবই ভালো হওয়ায় আমার স্বামী তখনকার মতো শান্ত হলেন।