মেয়েটি এল সন্ধ্যাবেলায়। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে বনের ভেতরে আমাদের হোস্টেল। চারপাশে গাছপালা দিয়ে আবৃত ছোট ডরমিটরি। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। আমি হোস্টেলের বারান্দায় বসে বনে সন্ধ্যাবেলার বৃষ্টি দেখছিলাম। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটার টপটপ শব্দ শুনতে দারুণ লাগছে। ধীরে ধীরে বনের ভেতর অন্ধকার নেমে আসছে। আমার মাথার ওপর একটা হলুদ আলোর বাতি জ্বলছে। কয়েকটা পোকা তার চারপাশে উড়ছে। একটা উঁচু টুলে বসে আমি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলাম বন্ধুর সঙ্গে। জায়গাটি ফিলিপাইনের মধ্য ভিসায়াস অঞ্চলের সিকিহোর দ্বীপ।
বৃষ্টির পানিতে মেয়েটির শরীর ভিজে গেছে। চুল গড়িয়ে পানি পড়ছে কাঁধে। সে মাথার হেলমেট খুলে রাখল। তার লালচে সোনালি চুল গালের ওপর এসে পড়ল। পিঠের ব্যাগটাও আধা ভেজা। মনে হচ্ছে সে দীর্ঘ দিন গরমের দেশে ঘুরছে। তার উজ্জ্বল ত্বকের ওপর তামাটে বর্ণের আস্তরণ। দীর্ঘদিনের রোদে পোড়া ত্বকে বৃষ্টির পানি নতুন এক দীপ্তি এনে দিয়েছে। চোখের নিচে ভাঁজ। পাতলা ঠোঁট, লম্বাটে চেহারা, মজবুত গড়নের মাঝারি আকৃতির শরীর।
আমাদের হোস্টেল ম্যানেজার গ্রেইস তাকে বিছানা বুঝিয়ে দিলেন। জায়গা হলো আমার বিছানার পাশেই। সে ভেজা জামাকাপড় খুলে রুমে ছড়িয়ে দিল। তার অনাবৃত পিঠে একটা কচ্ছপের ট্যাটু। তার সুগঠিত মসৃণ পা। গোড়ালির ওপরে একটা তারা। আমার দিকে কোমলভাবে তাকিয়ে বলল, ‘আমার নাম আন্তানেল্লা। আমি ইতালি থেকে এসেছি।’
আন্তানেল্লা বলল, আমার জন্ম হয়েছে অ্যারিটজো নামে ছোট এক শহরে। মধ্য ইতালির তাসকানি অঞ্চলে। ঢেউখেলানো পাহাড়, আঙুরখেত আর মধ্যযুগীয় সব পুরোনো বাড়ি। রাস্তার পাশে ছোট কফি শপ। জলপাইগাছ। মদ তৈরির কারখানা। এটি ফ্লোরেন্স থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে আজও মধ্যযুগীয় গ্রামীণ জীবন স্থির হয়ে আছে। একটু থেমে আবার বলল, সেখানে পুরোনো পাথুরে রাস্তায় মাইকেল এঞ্জেলো, লেওনার্দো দা ভিঞ্চি যেন হেঁটে চলেছেন অবিরাম। সুনীল আকাশের নিচে পিয়েরো দেল্লা ফ্রানচেস্কা ছবির ক্যানভাস খুলে রেখেছেন আজও।
বৃষ্টিভেজা রাস্তা। কোথাও কোনো কাদা নেই। জমে থাকা পানি নেই। আমি আর আন্তানেল্লা বনের বাড়ি থেকে ধীরে ধীরে বড় রাস্তায় উঠে এসেছি। কালো পিচঢালা পথ। বৃষ্টি থেমেছে। চারপাশে স্নিগ্ধতা। ঠান্ডা বাতাসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ভেসে বেড়াচ্ছে। নিশ্বাস নিলে বুকের ভেতর ঠান্ডা ও প্রশান্তিদায়ক অনুভূতি দেয়। বাতাসে বৃষ্টি ও সাগরের নোনা গন্ধ। রাত গভীর হয়নি। কিন্তু কোথাও মানুষ নেই। সবাই স্টোর, মদের দোকান, কফি শপ বন্ধ করে ঘুমোতে চলে গেছে। আমরা হেঁটে হেঁটে ভেতরে এসে একটা দোকান থেকে ব্রেড, ডিম আর দুধ কিনে নিলাম। ফ্রেন্স টোস্ট হবে ডিনারে আজ রাতে।
পরের দিন বিকেলবেলায় আমরা গেলাম সমুদ্রের পারে। সুলু সাগর। সীমাহীন দিগন্তজোড়া বিস্তৃত নীল জলরাশি। বুকে জেগে আছে হাজার হাজার দ্বীপ। ঘন সবুজ। তরু লতা-পাতা-পল্লবে আবৃত। ধবধবে সাদা বালুর সৈকত। নারকেলগাছের ছায়া পড়েছে আমাদের ওপর। পা ছড়িয়ে বসে আছি সাদা বালুর ওপর। আন্তেনেল্লা আমার ডান পাশে। সে ব্যাগ থেকে একটা আপেল আর কমলা বের করল। আমাকে জিজ্ঞেস করল, ম্যাগস তুমি কোনটা খাবে?
আমি বললাম, কমলা। আন্তেনেল্লা আপেল নিল। বালুতে অনেক পিঁপড়া একটা মিষ্টি-জাতীয় খাবার নিয়ে হুড়োহুড়ি করছে। সে তাকিয়ে আছে পিঁপড়ার দলের দিকে। পড়ন্ত বিকেলে সমুদ্রে মিষ্টি বাতাস। মাথার ওপরে নারকেলপাতার শনশনানি। কাপড় খুলে আমরা ধীরে ধীরে নীল পানিতে পা ভিজিয়ে দিলাম। হাঁটুপানি। তারপর কোমরসমান পানিতে এসে দাঁড়ালাম আমি। পানি বেশ উষ্ণ। আরামদায়ক। খুব স্বচ্ছ। এমনকি কয়েক মিটার পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। ঢেউ এসে আমাদের তরঙ্গের মতো দুলিয়ে দিচ্ছে। আন্তেনেল্লা সাঁতার কাটার চেষ্টা করছে। লবণের ঘনত্বের জন্য ভেসে থাকা খুব সহজ। আমরা দুজনে পাশাপাশি ভাসছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নামের মানে কী?
আন্তেনেল্লা বলল, ছোট ফুল। আন্তে মানে ছোট, নেল্লা মানে ফুল। আমার মা আমাকে ছোটবেলা থেকে এই নামে ডাকেন। আন্তেনেল্লা বড় হয়েছে ভূমধ্যসাগরের তীরে। আমাকে বলল, দক্ষিণ ইতালির কালাব্রিয়া শহরে মামার একটা বাড়ি ছিল। সেখানে আন্তেনেল্লা তার কাজিনদের সঙ্গে সময় কাটাত। ইতালির গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ— প্রায় তিন মাস। পুরো গ্রীষ্মকালই আন্তেনেল্লা শহরে তার কাজিনদের সঙ্গে হইচই করে করে বড় হয়েছে। আমাকে বলল, আমার ভীষণ সুন্দর ছেলেবেলা ছিল সেখানে। ঢেউয়ে ভেসে ভেসে আন্তেনেল্লা তার ছেলেবেলার গল্প বলে যাচ্ছে। কয়েকবার মাছেরা এসে আমাদের ঠোকর মেরে চলে গেল। আন্তেনেল্লা আমাকে প্রশ্ন করল, তুমি কি ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ সিনেমাটা দেখেছ? আমি বললাম, রোবের্তো বেনিনিই?
সে খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, জানো এই সিনেমার শুটিং হয়েছে আমার শহরে—অ্যারিটজোতে। সেখানে দেখানো বাচ্চাগুলো আমার স্কুলের বন্ধুরা।
আমরা পানি থেকে বালুতে উঠে এলাম। বালুর ওপর তোয়ালে বিছিয়ে আধা শোয়া হয়ে বসে আছে আন্তেনেল্লা। আমি টানটান হয়ে শুয়ে আছি বালুর ওপর। ফোন থেকে আন্তেনেল্লা আমাকে অ্যারিটজোর ছবি দেখাল। ঢেউখেলানো আঙুরখেত। পুরোনো গির্জা। মধ্যযুগীয় পাথরের রাস্তা। আমার মনে হচ্ছে, উঁচু-নিচু ঢেউখেলানো আঙুরখেতের পাশ দিয়ে আমি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি। আন্তেনেল্লা আমার পেছনে বসে আছে। তার সোনালি চুলগুলো এক টুকরা কাপড় দিয়ে বাঁধা। ফ্লোরাল, নীল ফুল, লতাপাতা। বাতাসে কানের কাছের চুল উড়ছে। গায়ে জ্যাকেট। হাঁটুর ওপরে স্কার্টের শেষ প্রান্ত লুটোপুটি খাচ্ছে তার মসৃণ ঊরুতে।
মানচিত্র থেকে আন্তেনেল্লাকে আমি আমার গ্রাম দেখালাম, যেখানে আমার ছেলেবেলা কেটেছে। ভরা বর্ষা, স্নিগ্ধ বৃষ্টি আমাকে কেমন প্রাণ দিয়েছে। বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে আমি আনমনা হয়েছি। ডুবে যাওয়া ধানখেতে কই মাছের লাফিয়ে লাফিয়ে ঘাসফড়িং ধরতে দেখেছি। চারপাশে ডুবু-ডুবু গ্রামে বর্ষায় আমি বন্দী ছিলাম। বাঁশের সাঁকো পার হয়ে স্কুলে গিয়েছি। কত সন্ধ্যায় আমার জ্বর এসেছে, পেটব্যথা হয়েছে।
শীতের কুয়াশামাখা সকালবেলায় আমি সরিষাখেতের মাঠ পেরিয়ে কীভাবে স্কুলে গিয়েছি। হলুদ ফুলের ওপর মৌমাছিরা কানে কানে কী কথা বলে, আমি খেতের আলে বসে তা শুনেছি। শরতের নীল আকাশ আমাকে কীভাবে উদাসীন করে তুলেছে। কলাগাছের ভেলায় ভেসে ভেসে আমি কচুরিপানার ফুল তুলে এনেছি। লাল শাপলা গলায় পেঁচিয়ে রাজা সেজেছি। সন্ধ্যারাতের ঝিঁঝি পোকার আলোয় পথ দেখে প্রতিবেশীদের বাড়িতে টেলিভিশন দেখতে গিয়েছি। সে বিস্ময়ে চোখ বড় করে বলল, তোমাদের গ্রামের রাত কি সত্যিই এত অন্ধকার হতো?
প্রতিদিন আমরা দুইবেলা ঘুরতে যাই। সৈকতে, ঝরনায় অথবা শুধু ড্রাইভে। মাঝে মাঝে বাজার করতে যাই। ফিরে এসে রান্না করি—চিকেন তিনলা, স্প্যাগেটি, ফ্রেন্স টোস্ট, সাদা ভাত, স্যার্ডিন মাছ। সে লক্ষ্মীমেয়ের মতো সব এশিয়ান খাবার খাচ্ছে। মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে না একেবারে। কোনো কিছুতে তার আপত্তি নেই। মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা। আগ্রহ, উচ্ছ্বাস, শ্রদ্ধা তার চোখে, চেহারায়। আমার থেকে সে ভালো ড্রাইভ করে। আমি তার পেছনে বসে থাকি প্রায়ই। দিন যাচ্ছে। বনের ভেতরে আমাদের খুব ধীরে সকাল হয়। মোরগের ডাকে ডরমিটরির দরজা খুলে দেখি বাইরে আমাদের কাপড় ঝুলছে রশিতে।
আজ সকালে আন্তেনেল্লা একাই স্কুটি নিয়ে চলে গেল। আবার ফিরে এল দুপুরের আগে। খুব আনন্দিত আর উচ্ছ্বাস নিয়ে আমাকে ডেকে বলল, দেখো কী এনেছি! একটা কার্টনের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ফুটফুটে বিড়ালছানা, খুব ছোট। মুরগির বাচ্চার মতো লোমশ। আমাকে বলল, একে পথে আমি একা ফেলে আসতে পারিনি। কাঁদছিল খুব। আমি জানি আমরা ট্রাভেলার। আমাদের নিজেদের থাকার জায়গা নেই। তারপরেও।
একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অন্তত বড় হওয়া পর্যন্ত। যেন সে নিজেই খাবার খুঁজে নিতে পারে। চলো এর খাবারের ব্যবস্থা করি। আমি কার্টন কেটে বিড়ালছানার জন্য ঘর বানিয়ে নিলাম। আন্তেনেল্লা বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
আন্তেনেল্লা ইতালিয়ান ভাষার শিক্ষক। বিভিন্ন দেশে ঘোরার পাশাপাশি সে ইতালিয়ান ভাষা শেখায় স্কুলের শিশুদের। আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছে আন্তেনেল্লার ভাষায় কথা বলি।
আমরা দুজন সান হুয়ান গিয়েছিলাম। একটা সৈকতে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার ওপরে নারকেল গাছ। সামনে ঢেউয়ের সঙ্গে নৌকা দুলছে। এখন ভাটা চলছে সাগরে। অনেক বাতাস সঙ্গে। আমাদের উড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে প্রায়। আমাদের সামনে সাগরের ওপাড়ে টালিনিস আগ্নেয়গিরি ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো বৃষ্টি। ভিজে ভিজে আমরা হোস্টেলে এলাম। জামা কাপড় বদলে বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছি। আন্তানেল্লার হাতে কফির গ্লাস। আমি পাশে বসে আছি সোফায় পা উঠিয়ে।
আন্তেনেল্লা কফির কাপে চুমুক দিয়ে হাসল।
বল আমার সঙ্গে, চিআও। আমি বললাম, চিআও।
এবার বল, মি চিআমো আজস।
আমি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলাম। সে মাথা নেড়ে হেসে দিল। অন্ধকার আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, চিইও।
দূরের সমুদ্রের দিকে দেখিয়ে বলল, মারে। তারপরে বললো, ওনডা। নারকেল গাছের দিকে তাকিয়ে বলল, পালমা ডা কোকো।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বেল্লো। তারপর একটু হেসে যোগ করল, সি বেল্লিসসিমো। আমি লজ্জা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এর মানে? সে বলল, তুমি খুব সুন্দর।
আমি মজা করে বললাম, ফিডানজাটা? সে হেসে মাথা নাড়ল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে তখনো। হোস্টেলের বারান্দায় নীরবতা। বনের ভেতরে ভেজা রাত। সে বলল, আমোরে। আমি আস্তে করে শব্দটা আবার বললাম, আমোরে। বাইরে বৃষ্টি তখনো থামেনি।