হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

পঁয়তাল্লিশোর্ধ্ব নারীদের একক ভ্রমণ: এক নতুন পথচলা

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

৫০ পার হওয়া একক নারী ভ্রমণকারীরা এখন ভ্রমণের সস্তা রূপ খোঁজা ছেড়ে নিজেদের সময়, মানসিক প্রশান্তি এবং অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগ করছেন। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের মধ্যে ভ্রমণপ্রবণতা নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশেষ করে ৫০, ৬০ কিংবা ৭০ বছরের কোঠায় থাকা নারীদের একা ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতা বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। এটি কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ানো নয়। একা ভ্রমণের মাধ্যমে তাঁরা হারিয়ে যাওয়া সময় পুনরুদ্ধার করার একটা চেষ্টা করেন। এ ছাড়া তাঁদের স্বাধীনতা এবং নতুনভাবে জীবন খুঁজে পাওয়ার এক সশব্দ উদ্‌যাপনের দেখা মেলে এই ভ্রমণজুড়ে। ‘গার্লস গাইড টু দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর এক সাম্প্রতিক জরিপ এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সী নারীরা গন্তব্যের চেয়ে অভিজ্ঞতার গভীরতাকে বেশি প্রাধান্য এবং ভ্রমণের চিরাচরিত ‘বিলাসিতা’র সংজ্ঞাকে এক নতুন মাত্রা দিচ্ছেন।

একক ভ্রমণের এই জোয়ারের মূল কারণ

জীবনযাত্রার বড় ধরনের পরিবর্তনই নারীদের একা ভ্রমণের মূল চালিকাশক্তি। সন্তান বড় হয়ে ঘরছাড়া, অবসর গ্রহণ, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর মতো জীবনের বড় কোনো অধ্যায় এই পরিবর্তনগুলো বয়ে আনে। এসব পার করার পর অনেক নারী এই বয়সে এসে প্রথমবার নিজের মতো করে বাঁচার সময় ও সুযোগ বেছে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো বান্ধবী বা সঙ্গীর অপেক্ষায় না থেকে নিজের ইচ্ছা পূরণ করতেই তাঁরা একা বেরিয়ে পড়ছেন। ৫০ পার হওয়া নারীরা এখন বুঝতে পারছেন, বয়স জীবনের দরজা বন্ধ করে না, বরং নতুন দরজা খুলে দেয়। কাজের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রম ও পরিবার সামলানোর পর, জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁরা আর নিজের আত্মোন্নয়ন ও অ্যাডভেঞ্চারকে বিসর্জন দিতে রাজি নন।

৫০, ৬০ কিংবা ৭০ বছরের কোঠায় থাকা নারীদের একা ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতা বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, অভিজ্ঞতার গভীরতা

এই বয়সের একক নারী ভ্রমণকারীদের কাছে মার্বেল পাথরের বাথটাব বা ফার্স্ট ক্লাস ফ্লাইটের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ। জরিপে ৪৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, গ্রুপ ট্রাভেলের ক্ষেত্রেও তাঁদের নিজেদের জন্য একটি আলাদা ঘরের প্রয়োজন। বিলাসবহুল হোটেলের চেয়ে তাঁদের কাছে বেশি প্রাধান্য পায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, শান্ত ও নিজের মতো থাকার জায়গা, যেখানে অন্য কারও নাক ডাকার শব্দ বা বিরক্তির সুযোগ নেই। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ নারী এক সপ্তাহের একটি বিশেষ ট্রিপের জন্য প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা বেশি খরচ করতে রাজি। তবে শর্ত একটাই, সেখানে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে ভ্রমণের গভীরতা ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। অভিজ্ঞ গাইড, স্থানটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং স্থানীয় খাঁটি খাবার আস্বাদন করাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার।

ছোট গ্রুপ ও বন্ধন

একা ভ্রমণ করলেও এই নারীরা সমমনা অন্য নারীদের সঙ্গ পছন্দ করেন। ৪৮ শতাংশ নারী ইতিমধ্যে কেবল নারীদের নিয়ে তৈরি কোনো ট্যুর গ্রুপে ভ্রমণ করেছেন। এটি প্রথমবার একা ভ্রমণকারীদের জন্য যেমন নিরাপদ, তেমনি নতুন বন্ধু তৈরির চমৎকার মাধ্যম। ভ্রমণ শেষেও এই সিস্টারহুডের বন্ধন বহু বছর বজায় থাকে। বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা কেবল মিউজিয়ামে ঘুরে কিংবা বেঞ্চে বসে সময় কাটাতে চান না। তাঁরা নিজেদের শারীরিক সক্ষমতাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। ইংল্যান্ডের কটসওয়ার্ল্ডস, কানাডিয়ান রকিজ কিংবা স্পেনের প্রায় ৮০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কামিনো ফ্রান্সেসের মতো হাইকিং রুটে এখন প্রবীণ নারীদের একক পদচারণ লক্ষণীয়। ৭০তম জন্মদিনে ৮০৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দেওয়ার মতো দৃষ্টান্তও রয়েছে। অনেক নারী বাইক রাইডিংয়ের মতো চ্যালেঞ্জিং অ্যাডভেঞ্চার বেছে নিচ্ছেন। প্রবীণ নারীরা কম বয়সীদের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা করেন, দিক নির্ণয়ে দক্ষ এবং যান্ত্রিক সমস্যাগুলো দারুণভাবে সামলাতে পারেন।

সংস্কৃতিতে ডুব দেওয়া

জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পটে ছবি তুলে টিক মার্ক দেওয়ার বদলে তাঁরা চান কোনো দেশের সংস্কৃতিতে পুরোপুরি ডুবে যেতে। ইতালির টাস্কানিতে মৃৎশিল্প তৈরি, ফ্রান্সে আর্ট রেসিডেন্সি, গ্রিসের ক্রিটে পাহাড়ের ছাগলের দুধ দোহানো কিংবা মরক্কোর স্থানীয় নারীদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী রুটিনে রুটি বানানো ও কাপড় বোনা শেখা—এসব অভিজ্ঞতা তাঁদের আকর্ষণ করে।

প্রচলিত ভুল ধারণা ও বাস্তবতা

এই বয়সের নারী ভ্রমণকারীদের নিয়ে সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তাঁরা হয়তো ভিতু, গাইড ছাড়া চলতে পারেন না কিংবা কেবল বয়স্কদের উপযুক্ত শান্ত জায়গা পছন্দ করেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং নতুন কিছু করার উদ্যমে ভরপুর। বয়সের বলিরেখা বা পাকা চুলের কারণে সমাজ অনেক সময় এই নারীদের অদৃশ্য করে ফেলে। অথচ তাঁরা জীবনের একটা বড় সময় সফলভাবে কাজ করেছেন, পরিবার গড়েছেন। এখন তাঁদের নিজেদের জীবনকে উপভোগ করার পূর্ণ স্বাধীনতা ও আর্থিক সক্ষমতা দুটোই আছে।

৫০ পার হওয়া একক নারী ভ্রমণকারীরা এখন ভ্রমণের কোনো সস্তা রূপ খোঁজা ছেড়ে নিজেদের সময়, মানসিক প্রশান্তি এবং অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগ করছেন। তাঁদের এই আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে—নতুন কিছু শুরু করার জন্য বা পৃথিবীটাকে জয় করার জন্য কোনো বয়সই শেষ বয়স নয়।

সূত্র: আফ্রিকা নিউজ