হেঁটে ভ্রমণ করার সিদ্ধান্তটা হঠাৎ নেওয়া নয়। এটি ছিল একধরনের প্রতিজ্ঞা—নিজেকে জানার, পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখার এবং মানুষকে কাছ থেকে বোঝার। আজকে যখন লিখছি, তখন ক্যালেন্ডারে মাসের নাম মার্চ। দেখতে দেখতে পৃথিবীর পথে পাথুরে বেড়ানোর ৭১৩তম দিন চলছে।
২০২৪ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করি। তখন জানতাম না, এই পথ আমাকে কত রকম উপলব্ধির সামনে দাঁড় করাবে। আজ পর্যন্ত আমি হেঁটে পাড়ি দিয়েছি ভারত, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া। এসব দেশ ঘুরে আবার এসেছি নেপালে। প্রতিটি দেশ নতুন কিছু শিখিয়েছে। দেখিয়েছে ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য, জীবনযাপন—সবকিছুতে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের হৃদয়ে এক আশ্চর্য মিল আছে।
প্রথমে ভারতের কথা বলি। একের ভেতর সব পাওয়া যাবে এখানে। ভারতে হাঁটতে হাঁটতে বুঝেছি, ধর্ম-সংস্কৃতি-ভাষার এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও সাধারণ মানুষের হৃদয় কতটা উদার হতে পারে। নেপালে এসে উপলব্ধি করেছি, সুখ মানে বড় শহর নয়, বরং ছোট পাহাড়ি গ্রামের আন্তরিকতা। হিমালয়ের কোলে সাধারণ মানুষের জীবন খুবই সাদামাটা, কিন্তু তাদের আতিথেয়তা অসাধারণ। মনে হয়েছে, এখানে মানুষ অল্পে তুষ্ট থাকতে জানে। আমি শিখেছি, প্রকৃতির কাছে গেলে মানুষ নিজেও বিনয়ী হয়ে যায়। উজবেকিস্তানে গিয়ে মনে হয়েছে, যেন ইতিহাসের ভেতর হাঁটছি। প্রাচীন সিল্ক রোডের শহরগুলো আমাকে বুঝিয়েছে, একসময় পৃথিবী সংযুক্ত ছিল মানুষের যাত্রা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে। আজও সেই সংযোগ মানুষের গল্পের মধ্যেই টিকে আছে। কী চমৎকার একটি দেশ! তাজিকিস্তানের পাহাড়ি পথ আমাকে শারীরিকভাবে বেশি চ্যালেঞ্জ করেছে। উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে, কীভাবে ভাষা না জেনেও ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হয়। এভাবে একে একে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় হেঁটেছি।প্রতিটি দেশ আমাকে নতুন নতুন চমৎকার সব অভিজ্ঞতা দিয়েছে। তবে আমি আজকে বিশেষ করে লিখব ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে।
ইন্দোনেশিয়া আমার দেখা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ট্যুরিস্ট-ফ্রেন্ডলি দেশ। সেখানকার সাধারণ মানুষ খুবই আন্তরিক। বাজেট ট্রাভেলারেরা নিশ্চিন্তে ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ করতে পারেন; বিশেষ করে হাইকিং, সাইক্লিং, বাইকিং কিংবা হিচহাইকারসদের ভ্রমণের জন্য আদর্শ দেশ ইন্দোনেশিয়া। যাঁরা নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি পছন্দ করেন তাঁদের জন্যও সেরা দেশ এটি। তবে মুসলিমপ্রধান হলেও ধর্মীয় ঘৃণা আমার চোখে পড়েনি ইন্দোনেশিয়ায়। আমি বাতাম, জাভা ও বালি; ইন্দোনেশিয়ার এই তিন দ্বীপে হেঁটেছি। প্রায় ৬ মাস ভ্রমণকালে আমাকে এক দিনের জন্যও হোটেলে থাকতে হয়নি।
ইন্দোনেশিয়ার একটি চমৎকার বিষয় হচ্ছে, সেখানকার মসজিদে গোসলখানা, টয়লেট, চা, কফি, খাওয়ার পানি এবং হালকা খাবার থাকে। যাঁরা বিশ্রাম নিতে আসেন, তাঁরা প্রয়োজনমতো খেতে পারেন। সব সময় মসজিদ খোলা থাকে। সারা রাত মানুষ যাতায়াত করার সময় বিশ্রাম নিতে পারেন। যেকোনো ধর্মের মানুষ মসজিদে বিশ্রাম নিতে পারেন। আমি অসংখ্য রাত মসজিদে তাঁবু খাটিয়ে ঘুমিয়েছি। ঘুম থেকে উঠে দেখেছি, তাঁবুর বাইরে খাবার রাখা। শুধু মসজিদ নয়, যেকোনো সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট, মার্কেট—সব জায়গায় টয়লেট এবং নামাজের ব্যবস্থা আছে। ফলে পথেঘাটে প্রস্রাব করার প্রবণতা ইন্দোনেশিয়ায় আমি তেমন দেখিনি।
ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের অসংখ্য সুন্দর গল্প আছে। যা বলে শেষ করা যাবে না। ছোট্ট দুটি গল্প বলি। আমি এক মসজিদে রাতে থাকি। বাইরে থেকে খাবার খেয়েছি। মসজিদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, খাবার খেয়েছি কি না। ‘খেয়েছি’ বলায় তিনি চলে গেলেন। প্রায় রাত ১১টার দিকে তিনি খাবার নিয়ে ফিরে এলেন! তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি যদি লজ্জায় না খেয়েও বল যে খেয়েছ, আর রাতে যদি না খেয়ে থাকো, তাহলে এই পাপের ভার আমি নিতে পারব না।
সেই দুশ্চিন্তায় আমি ঘুমাতে পারিনি।’ আমি এই কথা শুনে অবাক হলাম।
দ্বিতীয় ঘটনা বালিতে। বালিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি। তাই অনেক জায়গায় মসজিদে মাইকে আজান হয় না। আমি একটা মসজিদে উপস্থিত হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা তো মুসলিমপ্রধান দেশ, তাহলে মসজিদে আজান দেন না কেন? তিনি আমাকে বললেন, ‘আমরা এমন কাজ করব না, যাতে আমার প্রতিবেশী অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের কষ্ট হয়’। কথাটা শুনে খুব ভালো লাগল!
এমন অসংখ্য সুন্দর গল্প আছে পথের। যাঁরা বাজেট ট্রিপ বা নতুন নতুন সংস্কৃতি দেখতে চান, তাঁরা ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ করতে পারেন। সেখানে ছোট-বড় কত সংস্কৃতির মানুষ যে বসবাস করে, তার হিসাব নেই। আমি সুযোগ পেলে আবারও ইন্দোনেশিয়া যেতে চাইব। আমি হাঁটতে হাঁটতে এক দেশ থেকে অন্য দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষ থেকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাই। আমি দেখেছি, পৃথিবীর নানান প্রান্তে ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও মানুষের মৌলিক অনুভূতি একই।