পয়লা মের প্রথম প্রহরে, রাত বারোটার ট্রেনে কুমিল্লা থেকে শ্রীমঙ্গলের পথে রওনা হলাম আমরা আঠারো বন্ধু। ট্রেন আসার কথা রাত বারোটায়। মাত্র চল্লিশ মিনিট দেরিতে এল ট্রেন।
চলমান কামরার ঝনঝন শব্দ, চাকার সঙ্গে রেললাইনের ক্রমাগত কথোপকথন, জানালার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা রাতের বাতাস—সবকিছু মিলিয়ে একটা আধো ঘুমের দুনিয়া তৈরি হলো। আমরা
নিজ নিজ আসনে বসে। সকালে সারা দিন হাঁটতে হবে, তাই শরীর একটু বিশ্রামে রাখা। উদ্বেগের
সেই রাতটা কাটিয়ে ভোর প্রায় চারটায় আমরা শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামলাম।
স্টেশনে নামতেই বুঝে গেলাম, এখানকার বাতাস আলাদা। মৃদু স্যাঁতসেঁতে সবুজ গন্ধ, যেন পাহাড়
আর চা-বাগান মিলেমিশে জানান দিচ্ছে বাতাসে নিজেদের উপস্থিতি। রাতের ক্লান্তি থাকলেও সেই
গন্ধ শরীরে একটা অদ্ভুত সজীবতা এনে দিল।
সবাই মিলে প্রথমে ছবি তুললাম, স্টেশনের চারপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। ভোরের আজান শোনা গেল, শ্রীমঙ্গল স্টেশন মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলাম।
নামাজ শেষে গাড়ির বন্দোবস্ত হলো। পুরো দিনের ভ্রমণের জন্য প্রতিটি গাড়ি চার হাজার টাকায় ভাড়া নেওয়া হলো—আঠারোজনের জন্য দুটি গাড়ি। চান্দের গাড়ি শ্রীমঙ্গলের অনন্য বাহন। এতে বসে পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়া একটা আলাদা অভিজ্ঞতা।
প্রথম গন্তব্য লাল পাহাড়। নামটা শুনলে মরুভূমির পাথুরে দৃশ্যের কথা মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টো। লাল পাহাড়ে পৌঁছে চোখ থমকে গেল। চা-বাগান আর পাহাড় পরস্পর আলিঙ্গন করছে এখানে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে সবুজের ঢেউ, তার মাঝে মাঝে লাল মাটির রং মিলিয়ে একটা প্রাকৃতিক চিত্রকর্ম তৈরি হয়েছে। এখানে বানর আছে প্রচুর। দূরে কোনো গাছে বসে ডাকছে নাম না জানা পাখি। আমাদের মতো অনেক পর্যটক এসেছেন। তাঁরাও ছবি তুলছেন, হাঁটছেন, পাহাড়ের সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছেন।
শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানগুলোর মধ্যে নুর জাহান আলাদা বেশ খানিকটা আলাদা। এখানে এসে থমকে দাঁড়াতে হয়। বিভিন্ন আকৃতির পাহাড় এখানে নিজেই ভূগোলের পাঠ দিচ্ছে। আর সেই পাহাড়ের গায়ে নিপুণ হাতে বোনা চা-গাছের সারি! মনে হয় কোনো সুদক্ষ মালি বছরের পর বছর ধরে এখানে ফুলের বাগান করছেন। সবুজ পাতাগুলো সামান্য রোদে চকচক করছে, বাতাসে দুলে জানান দিচ্ছে তাদের সৌন্দর্য। যত বাগান দেখেছি, সেগুলোর মধ্যে নুর জাহান আকর্ষণীয়।
মাধবপুর লেকের কথা আগে থেকে শুনেছিলাম। তিন দিকে পাহাড়বেষ্টিত এই হ্রদ নাকি দেখতে অপার্থিব সুন্দর। সেই গল্প কতটা সত্যি, তা যাচাই করতে আমরা গেলাম। লেকে ঢুকতে গাড়িপ্রতি পঁচাত্তর টাকা দিতে হয়। লেকে ঢোকা যায় সকাল নয়টা থেকে। আমরা পৌঁছলাম আটটায়। সারা দিন ঠাসা ভ্রমণসূচি। সে জন্য টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে বলে নির্ধারিত মূল্য চুকিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল।
তিন দিক থেকে পাহাড় এসে যেন হ্রদটিকে কোলে তুলে নিয়েছে! পাহাড়ের গায়ে চা-বাগানের সবুজ সাম্রাজ্য, আর তার প্রতিফলন পড়েছে লেকের শান্ত জলে। লেকের পাড় ধরে হাঁটছি। এর মধ্যে
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টিটা ধীরে ধীরে ভারী হলো, তারপর যেন আমাদের কথা মনে করে একটু বিরতি নিল, যাতে আমরা ছবি তুলতে আর স্মৃতিতে জমা রাখতে পারি কিছু ছবি। আমরা বৃষ্টির বিরতিতে পাহাড়ে উঠলাম। ওপর থেকে যা দেখলাম, তার বর্ণনা দেওয়া সত্যিই কঠিন। কাছের পাহাড় আর দূরের পাহাড়, চা-বাগানের সবুজ ঢেউ, আর তাদের মাঝখানে স্থির হ্রদের জল—সব মিলিয়ে একটা দৃশ্য যা শুধু চোখ নয়, বুকের গভীরে স্পর্শ করে। এই
লেক আর পাহাড়ের বন্ধুত্বটা যেন চিরকালের। পাহাড় যখন গ্রীষ্মের তাপে জ্বলে, লেক তার পাশে থাকে শীতলতা নিয়ে।
সেখান থেকে আমরা গেলাম কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। মৌলভীবাজার জেলার এই চিরহরিৎ বন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এটি প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনজুড়ে বিস্তৃত। গেটে ঢুকতেই বানরের দলের দেখা মিলল। এক শ পনেরো টাকা টিকিট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। এই বনের শতবর্ষী শিরীষ, গর্জনসহ বিভিন্ন গাছ আকাশ ছুঁতে চাইছে। ডালে ডালে পাখির ডাক, মাটিতে শুকনো পাতার মর্মর। আরও ভেতরে গিয়ে একটি তথ্যফলক চোখে পড়ল। জানা গেল, এই বনের রেললাইন কোনো সাধারণ রেললাইন নয়। এখানেই ১৯৫৫ সালে শুটিং হয়েছিল অস্কারজয়ী হলিউড চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’। পরিচালক মাইকেল টড। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি সে বছর পাঁচটি অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছিল। এই একই বনে, আরও পরে, ২০০৮ সালে, চিত্রায়িত হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘আমার আছে জল’।
আমরা আরও গভীরে গেলাম, খাসিয়াপল্লিতে। এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পাহাড়ের ভেতরে নিজেদের জীবন গড়ে নিয়েছে। ছোট ছোট বাড়ি, কয়েকটি দোকান, সাধারণ নিত্যপণ্যের কেনাবেচা পাহাড়ের গভীরে এই জীবনের এক আলাদা শান্তি আছে।
দুপুরের পর গেলাম রাবারবাগান। রাবারগাছের সারি সারি বিন্যাস চা-বাগানের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য তৈরি করেছে। তারপর গেলাম সেই বিখ্যাত নীলকণ্ঠ চা কেবিনে, যেখানে সাত রঙের চা পাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গলে এলে এই চা না খাওয়া যেন তীর্থে গিয়ে মাথা না নোয়ানোর মতো। তাই খেলাম। কিন্তু স্বাদের প্রশ্নে সৎ থাকতে হবে, চা-টা কার্যত বিস্বাদ।
এরপর বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে গেলাম। এটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা নামে। এটি মূলত বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ও মিনি চিড়িয়াখানা। এখানে মায়া হরিণের লাজুক চোখ দেখলাম। ভালুক, বিপন্ন প্রজাতির লজ্জাবতী বানর, গন্ধগোকুল, বনবিড়াল, বন্য শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী আছে এখানে।
শেষ গন্তব্য বধ্যভূমি ৭১। সারা দিনের হাসি-গল্প-আনন্দের পর এখানে এসে সব চুপ হয়ে যায়। এই মাটিতে একদিন রক্ত পড়েছিল। এই মাটি শুষে নিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য। শ্রীমঙ্গল স্টেশনে ফিরে এলাম সন্ধ্যায়। ভ্রমণ শেষ। ব্যাগ কাঁধে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন আনন্দে ভরপুর। এই একটি দিনে কত কিছু দেখলাম, কত কিছু ভাবলাম। ট্রেনে উঠে ফেরার অপেক্ষা। এবারও হয়তো দেরি হবে। এবারও হয়তো চোর থাকবে। কিন্তু এই যাত্রার গল্প, এই দিনটার স্মৃতি—কেউ চুরি করতে পারবে না।