পাহাড়ি ঢাল বেয়ে সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে নেমে গেছে সারি সারি রঙিন দালান। একপলক দেখলে আপনার মনে হবে, হয়তো ইতালির বিখ্যাত ‘আমালফি কোস্ট’-এ দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু না, এই দৃশ্যের দেখা মেলে এশিয়াতেই। ভ্রমণ গন্তব্যের জনপ্রিয় দেশ ভিয়েতনামের এক দ্বীপে। সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা সেই স্বপ্নিল দ্বীপের নাম ফু কুয়োক। তবে হোই আন বা হুয়ের মতো এখানে শতবর্ষী ইতিহাসের প্রাচীন গন্ধ খুঁজতে গেলে আপনাকে কিছুটা থমকে যেতে হবে। ফু কুয়োকের বিশেষত্ব এর প্রাচীনত্বে নয়, বরং এর আধুনিক ও আন্তর্জাতিক রূপান্তরের সাহসিকতায় লুকিয়ে আছে। গত কয়েক দশকে এই দ্বীপ নিজেকে এমন এক ক্যানভাসে পরিণত করেছে, যেখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের স্থাপত্যশৈলী আর সংস্কৃতি এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
ফু কুয়োকের সান সেট টাউন এলাকায় গেলে ভূমধ্যসাগরীয় আমেজ আরও গাঢ় হয়ে ধরা দেয়। রোমান কলোসিয়াম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে হন থম কেব্ল কার স্টেশন, আর ভেনিসের সেন্ট মার্কস ক্যাম্পানিল টাওয়ারের আদলে গড়া ক্লক টাওয়ার। এগুলো পর্যটকদের ক্ষণিকের জন্য ইউরোপের কোনো প্রাচীন চত্বরে নিয়ে যায়। ফু কুয়োক মানেই দিগন্তজোড়া সূর্যাস্তের খেলা। সান সেট টাউনের পাথুরে সিঁড়ি কিংবা বাগানবিলাস ঘেরা বারান্দায় বসে আকাশ আর সমুদ্রের রঙের বদল দেখা যায়। তবে এই স্থাপত্যগুলো শুধু বিদেশের অন্ধ অনুকরণ নয়; এখানকার স্থাপত্যবিদেরা ইতালির নকশাকে ফু কুয়োকের আর্দ্র জলবায়ু আর কড়া রোদ-বৃষ্টির উপযোগী করে নতুন রূপ এনে দিয়েছেন। তাই বাড়ির রঙিন দেয়ালে যেমন ইউরোপের ছোঁয়া আছে, তেমনি ছাদে আর বারান্দার সবুজে মিশে আছে খাঁটি ভিয়েতনামি আবহ।
দ্বীপটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো কিস ব্রিজ। ইতালীয় স্থপতি মার্কো কাসামন্টির নকশা করা এই সেতু শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। সমুদ্রের ওপর দুটি আলাদা বাহু পরস্পরের দিকে এগিয়ে গেলেও ঠিক মাঝখানে একচুল পরিমাণ দূরত্ব রেখে থমকে গেছে। এই অপূর্ণতাই যেন সেতুটিকে দিয়েছে এক রহস্যময় রোমান্টিকতা। পাশেই রয়েছে নামজাদা স্থপতি বিল বেনসলির তৈরি করা জেডব্লিউ ম্যারিয়ট ফু কুয়োক এমারেল্ড বে রিসোর্ট এবং সান সিগনেচার গ্যালারি। এখানকার প্রতিটি কোণ আপনাকে কোনো এক কাল্পনিক ইতিহাসের গল্প বলবে।
আধুনিক ল্যান্ডমার্কের জন্য বিখ্যাত দুবাই কিংবা নগর-পরিকল্পনার জন্য আদর্শ সিঙ্গাপুরের মতো ফু কুয়োক ধাপে ধাপে নিজেকে পরিণত করেছে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে। সামনের বড় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং বড় কনভেনশন সেন্টার তৈরি। একসময়ের স্বল্প পরিচিত এই দ্বীপ আজ বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দ্বীপগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। ফু কুয়োক এখন শুধু একটি সৈকত নয়, এটি এমন এক মিলনস্থল, যেখানে পূর্ব আর পশ্চিমের স্থাপত্যের মেলবন্ধন ঘটেছে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পটভূমিতে।
সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস