হোম > জীবনধারা > মানসিক স্বাস্থ্য

নেতিবাচক আচরণ আপনাকে পিছিয়ে দিচ্ছে না তো

ফিচার ডেস্ক

‘সেলফ-স্যাবোটাজ’ বা অবচেতনভাবে নিজের ক্ষতি করা কোনো রোগ নয়, একটি নেতিবাচক আচরণের ধরন যা একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া। ছবি: পেক্সেলস

অনেকেই হয়তো লক্ষ্য করেছেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো অর্জনের ঠিক আগমুহূর্তে আমরা এমন কিছু করে বসি, যাতে পুরো পরিকল্পনাটিই ভণ্ডুল হয়ে যায়। ধরুন, আগামীকাল আপনার গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা বা মিটিং, কিন্তু আপনি সারা রাত জেগে অযথাই সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেন। একেই বলে ‘সেলফ-সাবোটাজ’ বা অবচেতনভাবে নিজের ক্ষতি করা। নিজের অজান্তেই নিজের ক্যারিয়ার, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে নষ্ট করে ফেলা। এটি কোনো রোগ নয়, বরং একটি নেতিবাচক আচরণের ধরন। এটি একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া, যা বুঝতে পারলে আপনি আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আবার ফিরে পেতে পারেন।

সেলফ-সাবোটাজের ৩টি প্রধান লক্ষণ

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, তিনটি অভ্যাসের মাধ্যমে আমরা সবচেয়ে বেশি নিজেদের ক্ষতি করি।

১. দীর্ঘসূত্রতা: কোনো কাজ বারবার পিছিয়ে দেওয়া। এটি অলসতা নয়, বরং ব্যর্থ হওয়ার ভয় বা অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয় থেকে জন্ম নেয়। যেমন যখন কোনো সম্পর্ক খুব সুন্দরভাবে এগোতে থাকে, তখন হঠাৎ করেই সঙ্গীর খুঁত ধরা শুরু করা বা অকারণে ঝগড়া করা। এর কারণ হলো সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ার আগেই আপনি সেটি নষ্ট করে দিয়ে নিজেকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কষ্ট থেকে ‘রক্ষা’ করতে চান।

২. পারফেকশনিজম: সবকিছু নিখুঁত করার অসম্ভব জেদ। যখন কোনো কিছু সামান্য ভুল হয়, তখন পারফেকশনিস্টরা ভেঙে পড়েন এবং হীনম্মন্যতায় ভোগেন। এতে কাজের গতি কমে যায় এবং সফলতা বাধাগ্রস্ত হয়। যেমন ব্যায়াম শুরু করার দুদিন পরই কোনো অছিলায় বাদ দেওয়া বা ডায়েট চলাকালে হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া।

যখন আপনার মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং সৃজনশীল থাকার কথা, ঠিক তখনই আপনি সেটি নিজের ক্ষতি করতে ব্যবহার করছেন। ছবি: পেক্সেলস

৩. নেতিবাচক আসক্তি: মানসিক অশান্তি বা ব্যর্থতার গ্লানি থেকে বাঁচতে মাদক, অ্যালকোহল বা নিজের ক্ষতি করার পথ বেছে নেওয়া। যেমন ছোট একটা টেক্সট বা ঘটনা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেবে কাজ থেকে দূরে থাকা।

কেন আমরা এমন করি?

এর শিকড় অনেক সময় লুকিয়ে থাকে আমাদের শৈশবে। যদি কোনো শিশু এমন পরিবেশে বড় হয়, যেখানে তাকে সব সময় বলা হয়েছে, ‘তুমি বড় কিছু করতে পারবে না’ বা ‘বেশি আশা করো না’, তবে বড় হওয়ার পর সফলতার মুখোমুখি হলে তার অবচেতন মন অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এই অস্বস্তি থেকেই সে নিজেকে সফল হওয়া থেকে আটকাতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি ‘সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে কাজ করে। মস্তিষ্ক যখন কোনো পরিবর্তন বা সফলতাকে ‘অচেনা’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে, তখন সে আমাদের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করে। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন, তাঁরা রাতে বেশি সেলফ-সাবোটাজ করেন। অর্থাৎ যখন আপনার মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং সৃজনশীল থাকার কথা; ঠিক তখনই আপনি সেটি নিজের ক্ষতি করতে ব্যবহার করছেন। এটি অত্যন্ত শক্তি ব্যয়কারী একটি প্রক্রিয়া।

মস্তিষ্ক যখন কোনো পরিবর্তন বা সফলতাকে ‘অচেনা’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে, তখন সে আমাদের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করে। ছবি: পেক্সেলস

এই চক্র থেকে বের হওয়ার উপায়

ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্রিস আর্মিটেজ এবং অন্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি পদক্ষেপ আপনাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার হতে সাহায্য করতে পারে।

ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। কারণ বড় কোনো লক্ষ্য দেখলে আমরা ঘাবড়ে যাই। তাই পুরো পাহাড় ডিঙানোর চিন্তা না করে প্রতিদিন একটি করে ছোট পদক্ষেপ নিন।

দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। ‘আমি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে চাই’ এভাবে না বলে বলুন, ‘আমি এমন একজন মানুষ যে, স্বাস্থ্যকর খাবার খায়।’ নিজের পরিচয় বদলে ফেললে লক্ষ্য পূরণ সহজ হয়।

বাধা আসার পরিকল্পনা আগে থেকেই করবেন না। আগে থেকেই ভেবে রাখুন, ‘যদি আমি কোনো বড় প্রজেক্ট দেখে ভয় পাই, তবে আমি শুধু প্রথম ৫ মিনিট সেটির পেছনে ব্যয় করব।’ একে বলে ‘ইফ-দ্যান’ ফর্মুলা। অধ্যাপক আর্মিটেজ একে বলেন ‘ইমপ্লিমেন্টেশন ইনটেনশন’।

মূল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সফল হতে ভয় পাচ্ছেন? নাকি আপনি মনে করেন, আপনি এ সাফল্যের যোগ্য নন? অতীতের কোনো তিক্ত কথা কি আপনাকে আটকে রাখছে?

সবচেয়ে জরুরি কাজটি তালিকার সবার ওপরে রাখুন। ট্যাক্স ফাইল না করে ঘর পরিষ্কার করাকে কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে আপনি আসল কাজটিই এড়িয়ে চলছেন।

সেলফ-সাবোটাজ কোনো স্থায়ী চারিত্রিক ত্রুটি নয়, এটি কেবল একটি শেখা আচরণ। সচেতনতা এবং ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে এই চক্র ভেঙে বেরিয়ে আসা সম্ভব। আজ থেকেই নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমার আজকের এ কাজটি কি আমাকে আমার স্বপ্নের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি দূরে ঠেলে দিচ্ছে?’

সূত্র: ভেরিওয়েল মাইন্ড, ডেইলি মেইল

শৈশবের একাকিত্ব বার্ধক্যে স্মৃতি চুরির একটি কারণ

সুখী ও দীর্ঘমেয়াদি দাম্পত্যজীবনের ১০টি টিপস

সন্তানের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিতে যা করতে পারেন, বলছে ইউনিসেফ

১০ মিনিটের ধ্যান কমাতে পারে মানসিক চাপ

অনুষ্ঠিত হলো দেশের প্রথম এআইএমএস সার্টিফায়েড ৩০ কিলোমিটার ম্যারাথন

মানসিক সমস্যার কারণে চুলকানি হলে কী করবেন

বয়স বাড়লে মানুষ কেন আপনজন থেকে দূরে থাকতে চায়

‘বেশি ভাবনা’ বা ওভার থিংকিং বন্ধ করবেন যেভাবে

শরীর ও মনের যত্নের ৮টি টিপস

মানসিক চাপ কমাতে নতুন ট্রেন্ড ‘অন্ধকারে গোসল’