হোম > জীবনধারা > মানসিক স্বাস্থ্য

এআই কি তরুণদের আত্মঘাতী করে তুলছে? যেসব কারণে এআই থেরাপি ভিত্তিহীন

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া

যেসব কারণে এআই থেরাপি অকার্যকর। ছবি: পেক্সেলস

আপনি যদি ‘থেরাপি’ ভেবে এআইয়ের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে থামতে হবে। প্রশ্ন হলো, এআই কি আদৌ কোনো কাজে দেয়? কিছু দিক দিয়ে দেয়, সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এআই থেরাপি কি সেই জিনিসগুলো দিতে পারে, যেগুলো সত্যিই আমাদের ভেতরের ক্ষত সারায়? আজকাল কিশোর-তরুণেরা বিষণ্নতা কাটাতে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলেন। সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজেন। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, ব্যথাহীন মৃত্য়ুর মাধ্য়মে নিজেকে কীভাবে শেষ করে দেওয়া যায়, সেই প্রশ্নেরও সমাধান তাঁরা চান এআইয়ের কাছে! এআই আবার এমন সব উত্তর দিচ্ছে, ফলে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এখানে প্রথমেই বলে রাখা ভালো, এআই কখনোই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাজ করতে পারে না। সে থেরাপিস্ট নয়। ফলে তার কথা ধ্রুব বলে ভেবে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

যেসব কারণে এআই থেরাপি অকার্যকর

মানুষের ভাষা বোঝে না এআই

কোনো থেরাপিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আপনার মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য শুধু আপনার কথার ওপর ভরসা করেন না; বরং আপনার শরীরের ভাষা, চোখের নড়াচড়া, কথা বলার গতি ও সুর, শ্বাসপ্রশ্বাস—এসব দিকে বেশি মন দেন। তিনি দেখেন, আপনার কথার ভেতর আর আপনার আসল ‘সত্তা’র মধ্যে কোনো ফারাক আছে কি না। এটাই জরুরি। এআই থেরাপি শুধু আপনার দেওয়া তথ্য নিয়েই খেলবে—আর আপনার সেই চুপ থাকা ব্যথার ভাষা, চোখের সেই অব্যক্ত কথা, সে বুঝতে পারবে না।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কাটাতে এআই সমাধান নয়। ছবি: পেক্সেলস

সম্পর্ক ছাড়া আরোগ্য হয় না

শুধু কৌশল বা টেকনিক থেরাপিতে আসল কাজ করে না; বরং থেরাপিস্টের সঙ্গে তৈরি হওয়া সেই মানবিক সম্পর্ক কাজে আসে। আমরা অনেকে বুকের ভেতর ব্যথা, দুঃখ, রাগ, অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব নিয়ে ঘুরি। কিন্তু যাঁদের কথা বলার মতো নিরাপদ জায়গা নেই, তাঁরা থেরাপিস্টের কাছে গেলে উপকার পান। থেরাপিস্ট একজন মানুষের লুকানো অংশগুলো বের করে আনেন। এআই যতই স্মার্ট কথাবার্তা বলুক, সে আপনার পাশে বসে আপনার অন্ধকার জায়গায় আলো ফেলতে পারবে না। সে বুঝতেও পারবে না সমস্যা সমাধানের জন্য কোন জায়গাটা নিয়ে কাজ করতে হবে।

এআই আমাদের আরও একা করে দিচ্ছে

এআই থেরাপি সহজ মনে হওয়ার একটা কারণ হলো, এতে নিজেকে পুরোপুরি দেখানোর ভয় ও দুর্বলতা দেখানোর ঝুঁকি থাকে না। ঠিক এখানেই ফাঁদ। যখন এআই আমাদের একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে, তখন আমরা ধীরে ধীরে ‘কেউ আমাকে বোঝে না’, ‘আমি চিরকাল একা’ ইত্যাদির মতো ভয়ংকর বিশ্বাসগুলোই পুষতে থাকি। থেরাপির প্রথম ধাপ হিসেবে এআই হয়তো কাজ করতে পারে, কিন্তু পুরো যাত্রা শুধু একা এআইয়ের সঙ্গে করা সম্ভব নয়।

এআই ‘থেরাপি’ যেভাবে প্রাণ কেড়ে নিতে পারে

২০২৫ সালের জুলাই মাসে কানাডার ২৪ বছর বয়সী অ্যালিস ক্যারিয়ার নামের এক তরুণী চ্যাটজিপিটিকে বলেছিলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই না।’ চ্যাটবটটি, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলছ’—এ রকম উত্তর দিল। পরদিনই অ্যালিস আর বাঁচলেন না। অ্যালিসের মা এখন ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, বলেছেন, তাঁর মেয়েকে বাঁচানোর জন্য একটিমাত্র সতর্কতাও পাঠায়নি ওপেনএআই। ঠিক একই বছরের নভেম্বরে, আমেরিকার কলোরাডোর বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী অস্টিন গর্ডন চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথনের পর আত্মহত্যা করেন। তাঁর মায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি তাঁর ছেলের ‘আত্মহত্যার কোচ’ হয়ে গিয়েছিল। চ্যাটবটটি মৃত্যুকে এক সুন্দর শান্তির জায়গা বলে বর্ণনা করেছিল—‘কোনো ব্যথা নেই, কোনো মন নেই, শুধু শেষ’।

এ রকম আরও ঘটনা রয়েছে। চ্যাটজিপিটি আত্মহত্যার পদ্ধতি পর্যন্ত বলে দিতে পারে। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে অ্যাডাম নামের একজন দড়ির ছবি আপলোড করেছিল চ্যাটবটে। তিনি উত্তর পান, ‘এই দড়িতে গিঁট দিয়ে মানুষের দেহ ঝোলানো সম্ভব।’ এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অ্যাডামের মা ছেলের ঝুলন্ত মরদেহ আবিষ্কার করেন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১২ লাখ মানুষ চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আত্মহত্যা বা আত্মক্ষতির বিষয়ে কথা বলে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল জানিয়েছে, এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আত্মহত্যা বেড়েই চলেছে। অথচ এখনো কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ ওই চ্যাটবটকে আটকায় না, কেউ চিৎকার করে বলে না, ‘তোমার দরকার মানুষের সঙ্গ, চ্যাটবটের কথা নয়।’

বাংলাদেশে এআই থেরাপির দিনলিপি

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি। স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ছে ঝড়ের গতিতে। মনোবিদেরা বলছেন, ডিজিটাল-নির্ভরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সেই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসংকটও। গবেষণায় দেখা গেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৪৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে এবং ৫০ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র উদ্বেগে ভোগেন। স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের মধ্যে দেখা গেছে ৮১ শতাংশ উদ্বেগে এবং ৮২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে। বাংলাদেশে মোট বিষণ্নতার হার কিছু গবেষণায় ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। ১০ বছর বয়সের আগে স্মার্টফোন পাওয়া শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা এবং আবেগজনিত সমস্যা অনেক বেশি দেখা যায়। এই প্রজন্ম সহজে এআই চ্যাটবটের কাছে যায়। মানসিক চাপে দিনের পর দিন চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলে।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কাটাতে এআই সমাধান নয়

এআই থেরাপির যতই উন্নতি হোক, তার সামনে এক অটল সত্য দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের মন অন্য মানুষ ছাড়া পুরোপুরি বোঝা যায় না। বিজ্ঞাপনে যতই ‘পারফেক্ট চ্যাটবট’ ও ‘ফ্রেন্ড ফরএভার’ দেখানো হোক না কেন, বাস্তবের মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকতে গেলে দরকার হয় একজন বন্ধুর হাতের উষ্ণতা। বাংলাদেশের প্রজন্ম জেড ও জেন আলফার সামনে আজ সেই সুযোগগুলো সংকুচিত হচ্ছে। একদিকে বিষণ্নতার সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে এআই চ্যাটবটে নির্ভরশীলতা ডেকে আনছে আরও বিচ্ছিন্নতা ও হতাশা। থেরাপি হলো দুই মানুষের মনের মেলবন্ধন। এআই বট তা প্রতিস্থাপন করতে পারে না, সেটা যতই শক্তিশালী হোক। স্মরণ রাখবেন, আবেগ দমন করে খুশি হওয়া যায় না। ওষুধ খেয়ে শরীর সুস্থ হয়, বটের কথায় মনের ক্ষত সারে না।

লেখক: সদস্যসচিব, প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ

ফোনে আসক্তি কাটাতে থেরাপি নিচ্ছেন অনেকেই

পুরুষের চেয়ে বেশি ঘুমাচ্ছেন নারীরা, অভিযোগ তবু তাঁদেরই বেশি

ঈদের ছুটির পর ফিটনেস রুটিনে ফিরতে যোগব্যায়াম

দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার কৌশল

শিশু যৌন নির্যাতনকারীরা পেডোফিলিয়া নামের একটি মানসিক রোগে আক্রান্ত

মস্তিষ্কের বার্ধক্য ঠেকানোর ৩ উপায়

মায়ের সঙ্গে নিরাপদ সম্পর্ক মানে নিরাপদ জীবন

জানেন কি, পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে বিষণ্নতার মূল কারণ

দাম্পত্য সম্পর্কে সবকিছু জানতে চাওয়া, ভালো না খারাপ

মন যখন কাঁদে, শরীর তখন কেমন থাকে