কারও সঙ্গে দেখা হলেই আমরা সহজভাবেই জিজ্ঞেস করি, ‘কেমন আছেন?’ জবাবে অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে এক পরিচিত শব্দ, ‘ভালো আছি।’ কিন্তু এই ‘ভালো থাকা’র কথাটির আড়ালে প্রায়ই চাপা পড়ে থাকে অলক্ষিত কোনো এক সত্যি। সমাজের রীতিনীতির কারণে অসুস্থ বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও আমরা সাধারণত বলতে অভ্যস্ত যে ‘আমি ভালো আছি।’ মানসিক চাপ বা স্ট্রেস মানেই যে দৃশ্যমান কোনো প্যানিক অ্যাটাক বা কান্নাকাটি, তা কিন্তু নয়। একজন সফল ব্যবসায়ী, ক্লাসের প্রথম সারির শিক্ষার্থী কিংবা মুখে হাসি নিয়ে থাকা গৃহিণীর ভেতরেও অদৃশ্য মানসিক চাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। দায়িত্ববোধ, লক্ষ্য অর্জন কিংবা আবেগ ঢেকে রাখার চেষ্টার আড়ালে আমরা প্রায়ই নিজেদের মানসিক কষ্টগুলো লুকিয়ে রাখি।
মানুষের এই নীরব থাকার পেছনে কাজ করে নানাবিধ কারণ। অনেকেই সমালোচনাকে ভয় পান। অন্যেরা কীভাবে বিচার করবে বা দুর্বল ভাববে কি না, সেই আশঙ্কায় অনেকেই মুখ খোলেন না। আবার অনেকের ওপরেই থাকে পরিবারের দায়িত্ব। তাঁরা পরিবারের সদস্য বা সন্তানদের সামনে নিজেদের শক্ত দেখানোর এক সামাজিক তাগিদ অনুভব করেন। আর সেই অনুভূতি থেকেই তাঁরা নিজের ভেতরের কথাগুলো লুকিয়ে রাখেন। আর একটি বিষয় হলো লিঙ্গভিত্তিক। কারণ, ছেলেদের ক্ষেত্রে শৈশব থেকেই ‘শক্ত থাকতে হবে’ বা কাঁদা যাবে না এমন এক সামাজিক ধারণা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা মন খুলে কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না।
মানসিক চাপকে উপেক্ষা করলে তা কিন্তু উধাও হয়ে যায় না। এটি মস্তিষ্ক ও শরীরের বড় ক্ষতিসাধন করে। দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেসের ফলে শরীরে 'করটিসল' নামক হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি আমাদের ঘুম ও খাওয়ার রুটিন নষ্ট করে এবং ঘনঘন মেজাজ বিগড়ে দেয়। গবেষকদের মতে, মনের অশান্তির সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যার কারণে মানসিক চাপ থেকে শারীরিক নানা হজমের সমস্যাও দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের অলক্ষিত স্ট্রেস মানুষকে বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। এমনকি এটি বয়সের গতি ত্বরান্বিত করে।
আমাদের দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রের চারপাশ থেকেও অনেক অদৃশ্য মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। ড. এস্টার স্টার্নবার্গ-এর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কীভাবে অজান্তেই মানুষের মানসিক চাপ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। আর্দ্রতার প্রভাব: বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৩০ শতাংশের কম বা ৬০ শতাংশের বেশি হলে মানুষের মানসিক চাপ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এটি অনেকে টেরও পান না। এমনকি এটি অনেক সময় আলো ও শব্দের প্রভাবেও হয়ে থাকে। অতিরিক্ত অন্ধকার বা অতিরিক্ত চড়া আলো মাথাব্যথার সৃষ্টি করে। আবার একেবারে নিস্তব্ধ পরিবেশ মানসিক চাপ বাড়ায়। পাখির ডাক বা সমপর্যায়ের ৪৫ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানসিক প্রশান্তির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। অফিসে টানা এক জায়গায় বসে না থেকে হাঁটার সুবিধা থাকলে মানসিকভাবে সুস্থ থাকা সহজ হয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে অন্ধকার বা ধোঁয়ার কারণে একেবারেই কিছু দেখতে না পাওয়ার অবস্থা তৈরি হলে মানুষের মানসিক চাপের ওপর কী প্রভাব পড়ে তা পরীক্ষা করা হয়েছে। ওই গবেষণায় দেখা যায়, সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন বা অন্ধকার পরিবেশে মানুষের ভেতরে আনন্দ বা সন্তুষ্টির অনুভূতি কমে যায়। তখন উদ্বেগ ও ভয় মারাত্মকভাবে বেড়ে যায় এবং হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে শারীরিক চাপের সম্পর্ক অনেক তীব্র হয়ে ওঠে।
স্ট্রেস বা মানসিক চাপ থাকবেই, তবে সেটিকে লুকিয়ে রাখা সমাধানের পথ নয়। দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিবেশের ছোট ছোট পরিবর্তনই আমাদের দিতে পারে এক সুস্থ মানসিক ও শারীরিক জীবন। মানসিক সংকট চরমে পৌঁছানোর আগেই নিজের যত্ন নেওয়া শুরু করতে হবে।
নিজের অনুভূতির নাম দিন: মনোবিজ্ঞানের একটি বিখ্যাত নিয়ম হলো 'নেম ইট টু টেম ইট'। অর্থাৎ, আপনি ঠিক কেমন অনুভব করছেন (যেমন: ভয়, হতাশা, নাকি ক্লান্তি) তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারলে সমস্যার সমাধান সহজ হয়।
কাজের পরিবেশ ভালো রাখুন: কাজের জায়গায় আলোর সুন্দর ব্যবস্থা রাখুন। পরিবেশ বেশি শুষ্ক বা স্যাঁতসেঁতে হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন।
বিরতি নিন ও হাঁটাহাঁটি করুন: একটানা বসে না থেকে প্রতি ২০ মিনিট পরপর একটু উঠে দাঁড়ান বা হেঁটে আসুন।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, হেলথ শর্টস, সায়েন্স ডাইরেক্ট ডটকম