হোম > জীবনধারা > মানসিক স্বাস্থ্য

এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম: যখন পরিচিত পৃথিবীও হয়ে পড়ে অচেনা

নাহিন আশরাফ 

এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম কোনো কল্পনার বিষয় নয়, এটি মস্তিষ্কের তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুভূতি তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিরল স্নায়বিক অবস্থা। প্রতীকী ছবি এআই দিয়ে তৈরি

ভাবুন, প্রতিদিন যে ঘরে ঘুমান, হঠাৎ একদিন সেই ঘরের দরজাটি আপনার চোখে অস্বাভাবিক বড় মনে হচ্ছে। খাটটি যেন অনেক দূরে সরে গেছে। অথচ বাস্তবে সেটি আগের জায়গাতেই আছে। নিজের হাত-পা কখনো অস্বাভাবিক ছোট, আবার কখনো অনেক বড় মনে হতে পারে। এমনকি কয়েক মিনিটকে মনে হতে পারে কয়েক ঘণ্টা কিংবা সময় যেন চোখের পলকে চলে যাচ্ছে। শুনতে অবাক লাগলেও এমন অভিজ্ঞতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সত্যিই হতে পারে। এই অদ্ভুত অনুভূতিকে বলা হচ্ছে এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম।

বোঝাই যাচ্ছে, নামটি এসেছে বিখ্যাত কল্পকাহিনি ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ থেকে। গল্পে এলিস কখনো নিজের আকার বদলে যেতে দেখে, কখনো চারপাশের জগৎকে স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্নভাবে অনুভব করে। বাস্তব জীবনে এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাও কিছুটা এমন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এটি কোনো কল্পনার বিষয় নয়, এটি মস্তিষ্কের তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুভূতি তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিরল স্নায়বিক অবস্থা।

আসলে কী ঘটে

আমরা চারপাশের পৃথিবীকে যেমন দেখি, সেটি শুধু চোখের কাজ নয়। চোখ থেকে পাওয়া তথ্য মস্তিষ্ক নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে। এরপর আমরা কোন বস্তু কত বড়, কত দূরে, কোন দিকে রয়েছে বা আমাদের শরীরের অবস্থান কোথায়—এসব বুঝতে পারি। এই প্রক্রিয়ার কোনো অংশ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হলে বাস্তব জিনিসও অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। একটি চেয়ার সত্যিই বড় হয়ে যায় না, কিন্তু মস্তিষ্ক সেটিকে বড় হিসেবে অনুভব করতে পারে। একইভাবে নিজের শরীরের কোনো অংশের আকার, ওজন বা অবস্থান সম্পর্কেও অস্বাভাবিক অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

যেসব অনুভূতি হতে পারে

এই সমস্যার অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে শুধু চোখে দেখা জিনিসের আকার বদলে যেতে পারে, আবার কারও নিজের শরীর সম্পর্কেও অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হতে পারে। কখনো মনে হতে পারে, একটি চায়ের কাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বড়। আবার একই কাপ কয়েক মুহূর্ত পর খুব ছোট মনে হতে পারে। ঘরের দেয়াল, দরজা বা আসবাবও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কাছে বা দূরে মনে হতে পারে। কিছু মানুষ নিজের হাত, পা বা মাথার আকার নিয়ে অস্বাভাবিক অনুভূতির কথা বলেন। হাত-পা যেন শরীরের তুলনায় অনেক লম্বা বা ছোট হয়ে গেছে—এমন অনুভূতিও হতে পারে।

এ রোগ হলে কারও ক্ষেত্রে শুধু চোখে দেখা জিনিসের আকার বদলে যেতে পারে। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

শুধু আকার বা দূরত্ব নয়, সময়ের অনুভূতিও বদলে যেতে পারে এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্তদের। কয়েক মিনিট খুব দীর্ঘ সময়ের মতো মনে হতে পারে। আবার কখনো মনে হয়, সময় অস্বাভাবিক দ্রুত চলে যাচ্ছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হলো, চারপাশের পরিবেশকে স্বপ্নের মতো মনে হওয়া। আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারেন, বাস্তবে কিছুই বদলায়নি, কিন্তু তাঁর অনুভূতিটা স্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ তিনি সাধারণত বুঝতে পারেন, সমস্যাটি বাইরের পৃথিবীতে নয়, নিজের উপলব্ধিতে।

যে কারণে এমন অনুভূতি হয়

চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘এই সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির সম্পর্ক পাওয়া যায়, তা হলো মাইগ্রেন বা একধরনের তীব্র মাথাব্যথা। বিশেষ করে যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এমন অস্বাভাবিক অনুভূতি দেখা দিতে পারে।’

এ ছাড়া কখনো ভাইরাসজনিত অসুস্থতার পরও এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে কিছু ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মৃগীরোগের সঙ্গেও এ ধরনের অভিজ্ঞতা যুক্ত হতে পারে বলে জানান সানজিদা শাহরিয়া। মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কারণে সাময়িকভাবে দৃষ্টি বা শরীর সম্পর্কে উপলব্ধিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

মাথায় আঘাত, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সমস্যা কিংবা মস্তিষ্কের কিছু গঠনগত সমস্যার ক্ষেত্রেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও অনুভূতির পরিবর্তন হতে পারে।

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত উদ্বেগও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতাকে উসকে দিতে পারে। তবে শুধু মানসিক চাপ থাকলেই যে কারও এই সমস্যা হবে, এমন নয়।’

কারা বেশি ঝুঁকিতে

এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম তুলনামূলকভাবে বিরল। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এ রোগের আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি বলে জানা যায়। তবে শুধু বয়সের কারণে কাউকে নিরাপদ বলা যায় না। প্রাপ্তবয়স্কদেরও এমন উপসর্গ হতে পারে। বিশেষ করে জীবনে প্রথম হঠাৎ এ ধরনের অভিজ্ঞতা হলে বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করা উচিত হবে না।

সমাধানের পথ

সানজিদা শাহরিয়া জানান, এই সমস্যার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। কারণ, এটি অনেক সময় অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। যদি মাইগ্রেন কারণ হয়, তাহলে চিকিৎসার লক্ষ্য হবে মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণ করা। কোনো সংক্রমণ থাকলে সেটির চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

মৃগীরোগের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে চিকিৎসক সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

তিনি আরও যোগ করেন, কোনো ওষুধের কারণে উপসর্গ তৈরি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজন হলে ওষুধ পরিবর্তন করা যেতে পারে।

এ ধরনের অনুভূতি হঠাৎ শুরু হলে প্রথমে আতঙ্কিত না হওয়াই ভালো। নিরাপদ জায়গায় বসে বা শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ঘুম এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি বারবার এমন হয়, তাহলে কখন উপসর্গ শুরু হচ্ছে, কতক্ষণ থাকে, তার আগে মাথাব্যথা হয়েছিল কি না, ঘুম কেমন হয়েছে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা পরিস্থিতির পর এটি ঘটেছে কি না—এসব লিখে রাখা যেতে পারে। চিকিৎসক এই তথ্যগুলোর কারণ খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অদ্ভুত এই অনুভূতি নিয়ে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক ক্ষেত্রে এটি সাময়িক। তবে শরীর ও মস্তিষ্কের দেওয়া সংকেত একেবারে অবহেলাও করা ঠিক নয়।

সূত্র: বিবিসি ও অন্যান্য