কখনো কি খেয়াল করেছেন, গভীর রাতে বৃষ্টির টিপটিপ শব্দ, আকাশে বজ্রের গর্জন কিংবা একটানা ঘুরতে থাকা ফ্যানের মৃদু আওয়াজ হঠাৎ মন কেমন শান্ত করে দেয়? সারা দিনের ক্লান্তি, অস্থিরতা আর হাজারো চিন্তার ভিড়ে কিছু শব্দ যেন নিঃশব্দে আমাদের কাঁধে হাত রাখে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞান বলছে, এটি শুধু অনুভূতি নয়, এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের জটিল এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। শব্দেরও আছে আলাদা রং, আর সেই রং নির্ধারণ করতে পারে আমাদের মনোযোগ, ঘুম কিংবা মানসিক প্রশান্তির মাত্রা।
ইউটিউবে হোয়াইট নয়েজ লিখে খুঁজলে দেখা যায়, কোটি কোটি মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব ভিডিওর বার্তা শুনছেন। কারও উদ্দেশ্য দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া, কেউ আবার পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে কিংবা কর্মব্যস্ত দিনের শেষে নিজেকে একটু রিলাক্স বা শান্ত করতে এসব শব্দের আশ্রয় নিচ্ছেন। শুধু হোয়াইট নয়েজই নয়। এর বাইরে আরও রয়েছে পিংক নয়েজ ও ব্রাউন নয়েজ। যেগুলো নিয়েও বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
পুরোনো বিভিন্ন বাংলা সিনেমায় প্রায়ই একটা ব্যাপার দেখানো হতো। কারও মন খারাপ হলে বা খুব বড় কোনো ঘটনা মেনে নিতে না পারলে চিকিৎসকেরা বলতেন, ‘নিরিবিলি কোথাও গিয়ে ঘুরে আসুন অথবা শহর থেকে দূরে কোথাও গেলে হয়তো স্বাভাবিক হবে।’ এমন দৃশ্য দেখে অনেকের হয়তো হাসি পেত। আবার অনেকের মনের মধ্যে হয়তো কৌতূহলও উঁকি দিত। নিরিবিলি কোথাও বা শহর থেকে দূরে গেলে পরিবেশের অনেক পরিবর্তন ঘটে। এতে মানসিক সুস্থতার কী আছে! এমনটা ভাবতেন অনেকে। অবশ্যই সুস্থতার জন্য প্রাকৃতিক কিছু অনুঘটক থাকে। শব্দ সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের কানে শোনা যায়, হোয়াইট নয়েজে এমন সব ফ্রিকোয়েন্সি প্রায় সমান শক্তিতে উপস্থিত থাকে। ফলে এটি একটানা ও স্থির শব্দ তৈরি করে। যেমন চলন্ত ফ্যান, এয়ারকন্ডিশনার বা রেডিওর স্ট্যাটিক শব্দ। হোয়াইট নয়েজ কিন্তু অন্য শব্দকে বাতিল করে না; বরং সেগুলোকে আড়াল করে বা ঢেকে দেয়। ঘরে একটি স্থির ও অপরিবর্তিত শব্দ সৃষ্টি করার মাধ্যমে এটি সামগ্রিক পটভূমির শব্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, ফলে হঠাৎ হওয়া শব্দ বা অন্যান্য বিরক্তিকর আওয়াজ ততটা স্পষ্টভাবে অনুভূত হয় না।
আমাদের শ্রবণ ব্যবস্থা সব সময় নতুন বা পরিবর্তিত শব্দ শনাক্তের চেষ্টা করে। তাই কোনো নতুন বা অপ্রত্যাশিত শব্দের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া বেশি হয়। কিন্তু হোয়াইট নয়েজের মতো একটি অবিচ্ছিন্ন ও স্থির শব্দ মস্তিষ্ককে কমসংখ্যক আকস্মিক শব্দের পরিবর্তন প্রক্রিয়াকরণ করতে বাধ্য করে। ফলে আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় একটি পূর্বানুমানযোগ্য শব্দের ওপর মনোযোগ ধরে রাখতে পারে এবং অন্যান্য সম্ভাব্য বিরক্তিকর শব্দ ধীরে ধীরে পটভূমিতে মিলিয়ে যায়।
স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও হোয়াইট নয়েজ মস্তিষ্কের সেই তরঙ্গগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যেগুলো আরাম ও গভীর ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কম তীব্রতার একটি স্থির শব্দের সংস্পর্শে থাকলে আলফা ব্রেইন ওয়েভের কার্যকলাপ বাড়তে পারে, যা মনকে আরও শান্ত ও প্রশান্ত অবস্থায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
পিংক নয়েজে, নিচু ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ কিছুটা বেশি থাকে। তাই এর ধ্বনি তুলনামূলক কোমল ও গভীর শোনায়। বৃষ্টির শব্দ, পাতার মর্মর কিংবা সমুদ্রের ঢেউ অনেকটা পিংক নয়েজের কাছাকাছি।
এই নয়েজে নিচু ফ্রিকোয়েন্সি প্রাধান্য পায়। দূরের বজ্রধ্বনি, প্রবল জলপ্রপাতের গর্জন কিংবা নদীর গভীর স্রোতের শব্দের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকের কাছে এই শব্দ সবচেয়ে আরামদায়ক মনে হয়।
অডিওলজিস্ট অ্যামি সারোর মতে, ব্রাউন নয়েজের গভীর কম্পন মানুষের মস্তিষ্ককে বিশ্রামের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। তাই এই ধরনের শব্দ অনেকের মধ্যে স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
এমনকি নবজাতকদের জন্যও ব্রাউন নয়েজের বিশেষ প্লেলিস্ট তৈরি করা হয়। গবেষকদের ধারণা, এটি মায়ের গর্ভের ভেতরের শব্দের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য তৈরি করে, যা শিশুকে সহজে শান্ত হতে সাহায্য করতে পারে।
শুধু আরাম বা ঘুম নয়, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাউন নয়েজ এডিএইচডিতে আক্রান্ত শিশুদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করতেও সহায়ক হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু কাহন বলেন, এডিএইচডিযুক্ত মানুষের মস্তিষ্কে অনেক সময় প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার ব্রাউন নয়েজ সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করে পড়াশোনা বা কাজের সময় মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
উদ্বেগে ভোগা মানুষ প্রায়ই আশপাশের ছোট ছোট শব্দেও বিচলিত হয়ে পড়েন। দরজার শব্দ, কারও পায়ের আওয়াজ কিংবা দূরের গাড়ির হর্নও তাঁদের মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিংক ও ব্রাউন নয়েজ এসব ছোটখাটো শব্দকে আড়াল করে দিতে পারে। ফলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হয়, মনোযোগ বাড়ে এবং ঘুম হতে পারে আরও গভীর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলাদা কোনো প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। প্রকৃতিই আমাদের জন্য তৈরি করে রেখেছে অসাধারণ কিছু নয়েজ। যেমন বৃষ্টির শব্দ, সমুদ্রের ঢেউ, ঝরনার কলকল কিংবা বাতাসে দুলতে থাকা গাছের পাতার মৃদু আওয়াজ—সবই অনেক সময় পিংক বা ব্রাউন নয়েজের মতো প্রশান্তি এনে দিতে পারে। অবশ্য ইউটিউব, স্পটিফাই কিংবা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপেও এখন সহজে এসব শব্দের অসংখ্য রেকর্ডিং পাওয়া যায়।
সংগীত নির্মাতা নিখিল কোপার্ডে দীর্ঘদিন ধরে ধ্যানের সংগীত ও বিভিন্ন সাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক মানুষের মস্তিষ্ক একই ধরনের শব্দে একভাবে সাড়া দেয় না। ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি আসতে পারে, যা একজন মানুষের মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তার জন্য উপযুক্ত ফ্রিকোয়েন্সির সংগীত তৈরি করবে।
আমরা শব্দকে শুধু শোনা যায়, এতটুকু জেনে এলেও আধুনিক গবেষণা বলছে, শব্দ শুধু কানে পৌঁছায় না; তা মস্তিষ্ক, অনুভূতি আর আচরণেও সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে। হয়তো সে কারণেই ক্লান্ত সন্ধ্যায় জানালার বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টির শব্দ আমাদের অকারণেই ভালো লাগায়। কিংবা গভীর রাতে ফ্যানের একটানা মৃদু গুঞ্জন অজান্তেই চোখে ঘুম নামিয়ে আনে। শব্দের এই অদৃশ্য রং হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু তার ছোঁয়া অনেক সময় মন ঠিকই অনুভব করে।
সোর্স: ভেরি ওয়েল মাইন্ড, পার্সে বুথস এবং অন্যান্য