হোম > জীবনধারা > মানসিক স্বাস্থ্য

পাহাড়ে গিয়ে সঙ্গীকে ত্যাগ—আবারও আলোচনায় ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

অ্যালপাইন পর্বতমালার একাংশ। ছবি: সিএনএন

অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্বত গ্রসগ্লকনার–এ এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে একটি অদ্ভুত কিন্তু উদ্বেগজনক সামাজিক প্রবণতা—‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হ্যাশট্যাগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অসংখ্য নারী তাঁদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, যেখানে পাহাড়ি অভিযানে সঙ্গী পুরুষ তাঁদের একা ফেলে চলে গেছেন, এমনকি অনেক সময় জীবনঝুঁকির মধ্যে রেখেই।

‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ বলতে সাধারণত এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যখন কোনো হাইকিং বা পর্বতারোহণের সময় একজন সঙ্গী (অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ) তাঁর তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ বা দুর্বল সঙ্গীকে বিপজ্জনক পরিবেশে একা ফেলে যান। এটি কোনো আইনগত বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত শব্দ না হলেও সম্পর্কের ভেতরের কিছু জটিল মনস্তাত্ত্বিক আচরণকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে চলতি বছরের বহুল আলোচিত অস্ট্রিয়ার মামলাটি। অস্ট্রিয়ায় থমাস পি নামে এক আরোহীকে তাঁর প্রেমিকার মৃত্যুর জন্য দায়ী করে দণ্ডিত করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী—থমাস দাবি করেছিলেন, সাহায্য আনতে গিয়ে তিনি প্রেমিকাকে একা রেখে যান। কিন্তু প্রসিকিউটরেরা জানান, থমাসের ফোনে সিগন্যাল থাকার পরও তিনি উদ্ধারকর্মীদের কল রিসিভ করেননি এবং যথাসময়ে বিপদ সংকেত পাঠাননি। এর ফলে তাঁর প্রেমিকা তীব্র ঠান্ডায় জমে মারা যান।

মামলার সময় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। থমাসের সাবেক এক প্রেমিকাও আদালতে সাক্ষ্য দেন, ২০২৩ সালেও থমাস একই পাহাড়ে ধীরগতির কারণে তাঁকে ফেলে গিয়েছিলেন। সাবেক প্রেমিকা জানান, অভিযানের সময় সমস্যায় পড়লে থমাস বিরক্ত হয়ে যেতেন এবং সহানুভূতির বদলে দূরে সরে যেতেন।

এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক নারী নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে শুরু করেন। একজন নারী একটি ভিডিওতে লিখেছেন, ‘তুমি তার সঙ্গে পাহাড়ে গেলে, কিন্তু সে তোমাকে একা ফেলে চলে গেল—তখনই বুঝলে, সে কখনোই তোমাকে সত্যিকারে ভালোবাসেনি।’ ভিডিওটি লাখো মানুষের নজর কেড়েছে। আরেকজন নারী স্কটিশ হাইল্যান্ডসে একা হাঁটার ভিডিও শেয়ার করে জানান, তাঁর সঙ্গী অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন, তাঁকে সম্পূর্ণ একা রেখে।

এই বিষয়ে রোববার সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ শব্দটির উৎপত্তি বেশ পুরোনো। ১৮৯৩ সালে স্কটিশ-কানাডীয় লেখক রবার্ট বার তাঁর একটি গল্পে এই ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে এক স্বামী সুইস আল্পসে স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। আজকের দিনে শব্দটির ব্যবহার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এলেও মূল ধারণাটি একই—বিপজ্জনক পরিবেশে সঙ্গীকে পরিত্যাগ।

আচরণগত মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জো হেমিংস বলেন, এই ধরনের আচরণ সাধারণত ‘এভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’–এর মানুষের মধ্যে দেখা যায়। চাপের মুখে তারা সমস্যার সমাধান না করে মানসিক ও শারীরিকভাবে দূরে সরে যেতে চান। তাঁদের মধ্যে সহানুভূতির অভাব থাকে এবং সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়।

হেমিংসের মতে, পাহাড়ি পরিবেশ এই আচরণকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়—কে নেতৃত্ব দেবে, কে পথ দেখাবে, কে গতি নির্ধারণ করবে। অনেক সময় সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং সঙ্গীর সঙ্গে তাল না মেলানো এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

তবে ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় বাবা, ভাই, বন্ধু বা অন্য ঘনিষ্ঠ পুরুষও নারীদের এমন অবস্থায় ফেলে যেতে পারেন।

এর একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লরি সিঙ্গার। ২০১৬ সালে তিনি জন মুইর ট্রেইলে দীর্ঘ হাইকিংয়ে বের হন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে। পথটি প্রায় ২২২ মাইল দীর্ঘ এবং শেষ করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই তিনি উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় ভুগতে থাকলেও তাঁর সঙ্গী কিছুতেই গতি কমাননি।

জীবনে এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন লরি সিঙ্গারও। ছবি: সিএনএন

এক রাতে লরি এতটাই পিছিয়ে পড়েন যে, ভয় পেয়ে বন্ধুর নাম ধরে চিৎকার করতে থাকেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। পরে বন্ধুটি জানান, তিনি নাকি পরীক্ষা করছিলেন লরি টিকে থাকতে পারেন কি না। আরও জানা যায়, লরি যথেষ্ট খাবারও নিয়ে যাননি। কারণ নিজের ওজন কমানোরও পরিকল্পনা ছিল তাঁর। অবশেষে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে, তিনি প্রায় হাঁটতেই পারছিলেন না। তখন তাঁর সঙ্গী তাঁকে একা ফিরে যেতে বলেন এবং হাতে দেন মাত্র একটি এনার্জি বার। এ অবস্থায় একা দুর্গম পথে হাঁটতে গিয়ে জীবনসংকটে পড়েছিলেন লরি। পরে অন্য হাইকারদের সাহায্যে তিনি বেঁচে ফিরলেও সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল।

এই অভিজ্ঞতার পর লরির পরামর্শ হলো—‘তুমি যতই কাউকে চিনো মনে করো না কেন, নিজের ওপর নির্ভরশীল হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ কখনো পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে, আবার অনেক সময় এটি তাৎক্ষণিক আচরণও হতে পারে—যা অসহিষ্ণুতা, নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা এবং সহানুভূতির অভাব থেকে জন্ম নেয়। তবে যে কোনো ক্ষেত্রেই এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ, এমনকি প্রাণঘাতী।

ভেঙে না পড়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করবেন যেভাবে

অনলাইনে শিশুকে নিয়ে পোস্টের আগে জানুন এর অন্ধকার দিক

সম্পর্কের নতুন জটিলতার নাম ‘টলিয়ামরি’

একটু থামুন, ফুলের গন্ধ নিন

মনোযোগ হারাচ্ছেন? জেনে নিন বাড়ানোর উপায়

ঘরের যে ৫ কাজ মানসিক শান্তি দেবে

শিশুদের ডিপ্রেশন বাড়াচ্ছে সেলফোনের ব্যবহার

প্রত্য়েকে তাঁরা পরের তরে

অ্যালার্মে ‘স্নুজ’ চাপা কি মস্তিষ্কের ক্ষতি করে?

যান্ত্রিক অ্যালার্ম নয়, পাখির সুরে শুরু হোক দিন