কখনো কি খেয়াল করেছেন, আপাতদৃষ্টে জীবনে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে আপনার ভেতরে অদ্ভুত একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। মনে হয় যেন হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও আপনি নিঃসঙ্গ, জীবনে অসংখ্য অর্জন থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্জনই আসলে যথেষ্ট মনে হয় না! কী একটা যেন নেই। সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, এমন কিছু একটা নেই, যেটা ছাড়া অস্তিত্বে টান লাগে। আধুনিক নাগরিক জীবনে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে, কোনো না কোনো সময় একাকিত্বের মধ্য দিয়ে যাই। ইমোশনাল হেলথ ও মনস্তত্ত্বের ভাষায়, মনের এই জটিল অবস্থাকে বলা হয় ইমোশনাল ব্ল্যাকহোল বা আবেগের কৃষ্ণগহ্বর।
মহাকাশের ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর যেমন তার সীমানায় আসা সবকিছুকে নিজের ভেতর টেনে নেয়, এমনকি আলোকেও বের হতে দেয় না; মানুষের মনের ইমোশনাল ব্ল্যাকহোলও ঠিক তেমনি। এটি হলো নেতিবাচক চিন্তা, একাকিত্ব, অতীতের ভুল এবং অপরাধবোধের এমন এক গহ্বর; যা মানুষের ভেতরের সমস্ত ইতিবাচক শক্তি, উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস শুষে নেয়।
এই অবস্থায় মনে বিষাদময় এক অনুভূতির জন্ম হয়। ‘আমি যা-ই করি না কেন, শেষ পর্যন্ত তো কিছুই বদলায় না!’ এ চিন্তাই এই ব্ল্যাকহোলের মূল আকর্ষণ বলয়।
সোশ্যাল মিডিয়া ও তুলনার ফাঁদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ‘নিখুঁত’ জীবনের সঙ্গে নিজের তুলনা করার অভ্যাস পরোক্ষভাবে আমাদের প্রতিনিয়ত চরম বিষণ্ন করে তোলে।
ভুল চিন্তার ধরন
নিজের ছোট ভুলগুলোকে পাহাড়সম করে দেখা, আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে চরম নেতিবাচক কিছু ভেবে নেওয়া এই ব্ল্যাকহোলের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যকে দোষারোপ বা আত্মপক্ষ সমর্থন
সম্পর্কে টানাপোড়েন বা যেকোনো ব্যর্থতার ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতার দিকে না তাকিয়ে সব সময় অন্যকে বা পরিস্থিতিকে দোষ দিলে মনের ভেতর একাকিত্ব ও তিক্ততা আরও বহুগুণ বাড়ে।
নিজের ভাবনার দর্শক হওয়া
কখনো মানসিক কষ্ট বা একাকিত্ব ঘিরে ধরলে সেই অনুভূতি থেকে পালিয়ে না গিয়ে সেটিকে শান্তভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, আপনার একটি বাজে চিন্তা বা বিষণ্ন মুহূর্ত আপনার সম্ভাবনাময় অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করে না।
সম্পর্কের স্বকীয়তাকে শ্রদ্ধা করা
নিজের ভেতরের একাকিত্ব মেটাতে সঙ্গী বা পরিবারের মানুষের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করবেন না। তাদেরও নিজস্ব মতামত, পছন্দ ও পরিমণ্ডল আছে। অন্যকে জোর করে পরিবর্তন করার চেষ্টার চেয়ে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কার্যকর।
বর্তমান মুহূর্ত যাপন করা
বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে প্রতিদিন ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করুন। ভালো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো, প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া কিংবা পছন্দের কাজ করা—এসব ছোট পদক্ষেপই শক্তির বড় উৎস।
একটি নির্দিষ্ট দৈনিক রুটিন বা লেখালেখির অভ্যাস মনের জট খুলতে সাহায্য করে। নিজেকে জানা মানে নিজের অনুভূতির ভাষা বুঝতে শেখা। মনের শক্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে কোনো থেরাপিস্ট বা বিশ্বস্ত প্রিয়জনের সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন।
এক দিনে যেমন ব্ল্যাকহোল তৈরি হয় না, তেমনি এক দিনে তা থেকে মুক্ত হওয়াও সম্ভব নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট ইতিবাচক অভ্যাস ও চিন্তা ধীরে ধীরে আপনাকে এখান থেকে বেড়াতে সাহায্য করবে।
মন খারাপ বা একাকিত্ব আমাদের জীবনেরই অংশ, এগুলো কোনো স্থায়ী ব্যাপার নয়। যখনই মনে হবে কোনো অদৃশ্য অন্ধকার আপনাকে গ্রাস করছে, তখনই নিজেকে মনে করিয়ে দিন, ভবিষ্যৎ এখনো অলেখা এবং বর্তমানের নিয়ন্ত্রণ আপনার নিজের হাতেই। নিজের মনকে একটু সময় দিন, কথা বলুন কাছের মানুষের সঙ্গে, তাহলেই অন্ধকার পেরিয়ে আলোতে ফেরার পথ সহজ হবে।
সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি ফ্যানাটিক ও অন্যান্য