আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিচ্ছেদ, প্রিয় মানুষের বিদায় কিংবা ক্যারিয়ারের বড় কোনো বিপর্যয়—এসব ঘটনা শুধু আমাদের চারপাশটা বদলে দেয়। শুধু তা-ই নয়, এসব বদলে দেয় আমাদের ভেতরের মানুষটাকেও। আমরা তখন দিশেহারা হয়ে পড়ি। একটা সময় নিজের পরিচয় নিয়ে সংশয়ে ভুগি। কিন্তু মনে রাখবেন, ভেঙে পড়াই শেষ কথা নয়। জীবনকে যেকোনো বয়সে, যেকোনো পরিস্থিতি থেকে নতুন করে সাজানো যায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার এই যাত্রায় আপনাকে সাহায্য করতে পারেন শুধু আপনি নিজেই। তাই এর পথ আপনাকে জেনে রাখতে হবে।
নিজেকে সময় দিন এবং বাস্তবতা মেনে নিন
বিপর্যয়ের ঠিক পরেই নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করবেন না। যেকোনো পরিস্থিতি আপনার মনকে ভেঙে দিতেই পারে। আর তাঁর জন্য কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। আপনার ভেতর যে কষ্ট, ক্ষোভ বা শোক আছে, তা নিজেকে অনুভব করতে দিন। কান্নায় লজ্জা নেই। এটি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মনের ভার হালকা করে। আগে কেঁদে নিন। এরপর নিজেকে শক্ত করুন। অতীতের ভুল নিয়ে বারবার পড়ে না থেকে বর্তমানকে গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন, পুরোনোকে বিদায় না জানালে নতুনের আগমন সম্ভব নয়।
নেতিবাচক চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন
বিপদের সময় আমাদের মন সারাক্ষণ বলতে থাকে, ‘আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না’ বা ‘সব আমার দোষ’। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের একধরনের সুরক্ষাকবচ। এই চিন্তা আমাদের নতুন কোনো যন্ত্রণায় পড়তে বাধা দেয়। নিজের সঙ্গে নেতিবাচক কথোপকথন বন্ধ করুন। নিজের দুর্বলতার বদলে শক্তির জায়গাগুলো খুঁজে বের করুন। আপনি আগে কী কী ভালো কাজ করেছেন, সেদিকে নজর দিন।
শুরু হোক যাত্রা ছোট ছোট পদক্ষেপে
এক দিনে সব বদলে ফেলার চেষ্টা করলে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। প্রথমে লক্ষ্য স্থির করুন। এরপর ছোট ছোট পদক্ষেপ সাজান। ধরুন, আজ হয়তো শুধু ঘরটা পরিষ্কার করলেন। তাহলে কাল একটু হাঁটতে বেরোলেন। নিজেকে সময় দিন আর ধৈর্য ধরুন। নিজেকে ভালোবাসার মানে হলো, নিজের প্রতি সদয় হওয়া। কোনো দিন যদি পরিকল্পনামতো কাজ না হয়, তবে নিজেকে দোষ দেবেন না। অতীতের ভুলগুলোর জন্য নিজেকে ক্ষমা করে দিন। আপনি একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, আর মানুষেরই ভুল হয়।
মনের যত্ন নিন
আপনার মনকে বিশ্বের সেরা চিন্তাবিদদের সান্নিধ্যে নিয়ে যান। টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি বা নিৎসের সাহিত্য পড়ুন। দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের বই আপনাকে জীবনের নতুন অর্থ শেখাবে। জ্ঞানের সংস্পর্শে এলে চিন্তার জগৎ বিকশিত হয়। আপনার মনে হবে, এটি এমন এক বাগান, যেখানে নতুন নতুন ভাবনার ফুল ফুটবে। সাহিত্য ভালো না লাগলে গান শুনুন। সেখানের লাইনগুলোতে বলা কথা বোঝার চেষ্টা করুন।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন
সুস্থ মন বাস করে সুস্থ দেহে। নিয়মিত শরীরচর্চা শুধু আপনার পেশি নয়, আপনার আত্মবিশ্বাসও বাড়াবে। সুষম খাবার শরীরে শক্তি জোগাবে। পাশাপাশি মেডিটেশন বা গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক প্রশান্তি দেবে। যদি প্রয়োজন মনে করেন, একজন পেশাদার থেরাপিস্টের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না। মনে রাখবেন, সাহায্য চাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং সাহসিকতার লক্ষণ। বড় বিষয়, আপনার মনের সমস্যা আপনিই বুঝতে পারছেন। আর এই বুঝতে পারাটাই অনেক বড় বিষয়। এরপর কী করতে হবে, তা আপনিই এমনিতেই ঠিক করে ফেলতে পারবেন।
নতুন মানুষ ও নতুন সৃজনশীলতা
জীবনকে নতুন করে চিনতে হলে নতুন কিছু শেখা প্রয়োজন। আবৃত্তি, অভিনয়, ছবি আঁকা কিংবা নাচের ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন। এতে নতুন দক্ষতা তৈরি হবে। পাশাপাশি আপনি এমন একদল মানুষের দেখা পাবেন, যাঁরা আপনার মতোই নিজেকে উন্নত করতে চান। একাকিত্ব দূর করার এটি চমৎকার উপায়।
শিখুন আর শেখান
আমরা সারা দিন ইন্টারনেটে অন্যদের তৈরি কনটেন্ট দেখি বা পড়ি। এই ভূমিকাটা বদলে ফেলুন। আপনার যা অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান আছে, তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। ব্লগ লিখতে পারেন বা একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলতে পারেন। মনে রাখবেন, যে শেখায় সে দুবার শেখে। যখন আপনি অন্যকে সাহায্য করার জন্য কিছু করবেন, তখন নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
নিজের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হোন
আমরা অন্যের কাছে দেওয়া কথা রাখার জন্য জানপ্রাণ লড়িয়ে দিই। কিন্তু নিজের কাছে দেওয়া কথা ভুলে যাই। জীবন নতুন করে গড়ার জন্য সবচেয়ে বড় দরকার নিজের প্রতি সততা। একটি ডায়েরি লেখা শুরু করুন। নিজের ভেতরের দানবদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য লেখা হলো সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এটি আপনাকে লক্ষ্য স্থির রাখতে সাহায্য করবে।
আপনার জীবন আপনার হাতে। একে আবার সুন্দর করে তোলার দায়িত্বও আপনার। আজ থেকে ছোট কোনো একটি পরিবর্তন দিয়ে শুরু করুন আপনার নতুন পথচলা। আশা হারাবেন না।
সূত্র: আ কনশাস রিথিংকিং, হ্যাভিং টাইম, স্টার্স ইনসাইডার