হোম > জীবনধারা > খাবারদাবার

ইতালিতে চলছে পর্যটকদের পকেট কাটার ট্রেন্ড

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

ইতালির মতো দেশেও খাবারের স্বাদ এখন হয়ে গেছে কমার্শিয়াল গিমিক! ছবি: পেক্সেলস

শৈশবের রোদেলা দুপুরে দাদি-নানির মমতা মাখা হাতে গড়া নকশিকাঁথার সেলাই কিংবা হেঁশেল থেকে ভেসে আসা পিঠা-পায়েসের মায়াবী সুবাস—এসব শুধু স্মৃতি নয়। আমাদের বেড়ে ওঠার নিখাদ শৈশব। সময়ের নিয়মে শৈশব পেরিয়ে যখন আমরা নাগরিক জীবনের তীব্র ব্যস্ততায় হারিয়ে যাই, তখন হঠাৎ কোনো এক সন্ধ্যায় সেই চিরচেনা ভালোবাসার স্পর্শগুলোর জন্য মনটা বড্ড ব্যাকুল হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির ভিড়ে কিংবা যান্ত্রিক রেস্তোরাঁর স্বাদে হাজারো বৈচিত্র্য মিললেও নানি-দাদিদের পরম যত্নে বানানো খাবার আর নিখুঁত হাতের কাজের ভেতর যে ভালোবাসা, অনুভূতি ও আত্মিক টান লুকিয়ে থাকত, তার বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না। এই অনুভূতি কোনো কৃত্রিম আয়োজন দিয়ে কেনা যায় না, এটি মনের গহিনে জমে থাকা এক চিরন্তন নস্টালজিয়া ও না-মেটা আক্ষেপ।

মানুষের এই সর্বজনীন নস্টালজিয়া ও আবেগকে পুঁজি করে বিশ্ব পর্যটনে শুরু হয়েছে এক নতুন ধারা, যাকে বলা হচ্ছে নোনাম্যাক্সিং। ইতালীয় ভাষায় ‘নোনা’ শব্দটির অর্থ দাদি বা নানি। ইতালির পরিবারগুলোতে বয়স্ক এই নারীরাই বংশপরম্পরায় খাঁটি ঘরোয়া রেসিপি ও রান্নার ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু মানুষের মন থেকে নিখাদ ভালোবাসা খুঁজে নেওয়ার এই আকুতিকেই ইতালির রোম শহরের রেস্তোরাঁগুলো এখন রূপ নিয়েছে এক নতুন বাণিজ্যিক চাল বা ট্যুরিস্ট ট্র্যাপে।

ইতালির পরিবারগুলোতে বয়স্ক নারীরাই বংশপরম্পরায় খাঁটি ঘরোয়া রেসিপি ও রান্নার ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছেন। ছবি: পেক্সেলস

সংস্কৃতি নাকি কমার্শিয়াল গিমিক

সাদামাটা, সুস্থ ও শান্ত জীবনধারাকে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রহণ করার একটি প্রবণতা সম্প্রতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে পর্যটকেরা নিজ হাতে রান্না করা, বাগান করা কিংবা ডিজিটাল ডিটক্সের মতো অভ্যাসে ঝুঁকছেন। তবে গ্রীষ্মের পর্যটন মৌসুমে এই ট্রেন্ড রোমের রেস্তোরাঁগুলোয় পৌঁছালে তা এক নতুন বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে রোমের অনেক রেস্তোরাঁ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তাদের রাস্তার পাশের জানালায় বয়স্ক ইতালীয় নারীদের বসিয়ে রাখছে। পর্যটকেরা বাইরে থেকে দেখছেন, কীভাবে তাঁরা হাত দিয়ে তাজা পাস্তা বানাচ্ছেন, খামির বেলছেন এবং খাবারের নির্দিষ্ট আকৃতি দিচ্ছেন। উৎসুক পর্যটকেরা সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করছেন এবং দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। পর্যটকেরা এটি দেখে উৎফুল্ল হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও খাদ্যবিশেষজ্ঞদের মতে এটি একটি নিখাদ ট্যুরিস্ট ট্র্যাপ বা পর্যটকদের পকেট কাটার ফাঁদ।

রেস্তোরাঁর জানালার বিতর্ক ও সমালোচনা

বর্তমানে রোমের অনেক রেস্তোরাঁ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তাদের রাস্তার পাশের জানালায় বয়স্ক ইতালীয় নারীদের বসিয়ে রাখছে। ছবি: সংগৃহীত

খাদ্যপ্রেমী ও শেফদের অনেকে এই নতুন ট্রেন্ডটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। অনেকে একে বলছেন চিড়িয়াখানার মতো অনুভূতি। ফুড ট্যুর কোম্পানি ভিয়া রোসা ইতালির সহপ্রতিষ্ঠাতা সোফি মিনচিলি বলেন, ‘এটি দেখতে অনেকটা চিড়িয়াখানার মতো লাগে। পাস্তা হয়তো ঘরে তৈরি এবং সুস্বাদু, কিন্তু এভাবে মানুষকে কাচের পেছনে প্রদর্শনীতে রাখা একদমই অনুচিত।’ লন্ডনের বিখ্যাত নাপোলি অন দ্য রোডের নাপোলি বংশোদ্ভূত শেফ মিকেলে পাস্কারেলা জানান, ‘ইতালির সত্যিকারের কোনো মানসম্মত রেস্তোরাঁয় মানুষকে জানালায় বসিয়ে পাস্তা বানাতে দেখানোর চল নেই। যেখানে এটি দেখা যায়, ধরে নিতে হবে সেটি আসল রেস্তোরাঁর চেয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করার কৃত্রিম প্রদর্শনী বা কিচি ট্যুরিস্ট ট্র্যাপ।’ রোমের অধিবাসীরা জানিয়েছেন, রেস্তোরাঁ খাঁটি হলে স্থানীয়রাই খাবারের জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ায়। আর পর্যটকেরা দাঁড়ায় শুধু ইনস্টাগ্রাম যেখানে দাঁড়াতে বলে, সেখানে। তাঁদের মতে, রোমের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলের বেশির ভাগ রেস্তোরাঁই এখন পর্যটকবান্ধব ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

সেলাইয়ের সুচ ছেড়ে পাস্তার খামিরে

ডোরা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হলেও তাঁর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিখ্যাত ইউটিউব চ্যানেল পাস্তা গ্র্যানিজে ফিচার হওয়ার পর। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭০-এর দশকে স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে পুগলিয়া থেকে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে পাড়ি জমান ডোরা। সঙ্গে ছিল মাত্র ২ হাজার ৫০০ ডলার। মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে তিনি দরজির কাজ করতেন। কিন্তু ১৯৯৪ সালে তাঁর ছেলে নিকোলা ম্যানহাটনে আই ট্রুলি নামের একটি ইতালীয় রেস্তোরাঁ খুললে ডোরা তাঁর সেলাইয়ের কাজ ছেড়ে যোগ দেন ছেলের হেঁশেলে। প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে নিজের হাতে শত শত মানুষের জন্য ওরেকিয়াত্তে, গ্নোচি আর ম্যালোরেদ্দুস বানাতেন তিনি। ডোরা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হলেও তাঁর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিখ্যাত ইউটিউব চ্যানেল পাস্তা গ্র্যানিজে ফিচার হওয়ার পর। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর তৈরি পাস্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অভূতপূর্ব ক্রেজ। ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে কিপস বের ছোট্ট জায়গা ছেড়ে ট্রাইবেকায় স্থানান্তরিত হয় তাঁর নিজস্ব রেস্তোরাঁ নোনা ডোরা’স ট্রাইবেকা। বর্তমানে সেখানে ডোরা নিজের হাতে প্রশিক্ষিত একদল নারীর সহায়তায় প্রতিদিন ক্যাভাতেলি, পাপারদেলে, ম্যাকারনচিনিসহ ১৫ রকমের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ইতালীয় পাস্তা পরিবেশন করেন। রোমের বুটিক রেস্তোরাঁর কৃত্রিম প্রদর্শনীর ভিড়ে ৯১ বছরের ডোরা প্রমাণ করেছেন, খাদ্য শুধু গিমিক বা ব্যবসার উপকরণ নয়, এটি ঐতিহ্য রক্ষা ও ভালোবাসার এক চিরন্তন মাধ্যম।

তবু যেখানে উপচে পড়া ভিড়

বিতর্কের মাঝেও ওস্তেরিয়া দা ফোর্তুনাতার মতো বেশ কিছু রেস্তোরাঁ এই ট্রেন্ড ব্যবহার করে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেক পর্যটকের মতে, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই পরিবার থেকে শেখা ঐতিহ্যবাহী রেসিপি ও তাজা উপাদান দিয়ে তৈরি এসব পাস্তা সত্যিই অসাধারণ। তবে সত্যিকারের ইতালীয় স্বাদ ও সংস্কৃতির খোঁজ পেতে হলে কাচের জানালার ওপারের সাজানো প্রদর্শনী এড়িয়ে চলাই ভালো। তার চেয়ে বরং এমন কোনো রেস্তোরাঁয় যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যেখানে বাস্তব জীবনের কোনো ‘নোনা’ পরম তৃপ্তিতে খোলা আকাশের নিচে বসে নিজের প্রিয়জনদের সঙ্গে রাতের খাবার উপভোগ করছেন।

সূত্র: দ্য ডেইলি মেইল, ইতালি সেগ্রেতা