কাজের প্রয়োজনে দিনের একটি বড় অংশ আমাদের অফিসে কাটাতে হয়। সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিদিন মেলামেশা করতে করতে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের সঙ্গে একধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে নতুন শহরে মানিয়ে নিতে বা কাজের মানসিক চাপ কমাতে এই বন্ধুত্ব দারুণ ভূমিকা রাখে। তবে কর্মক্ষেত্রে এই প্রিয় সম্পর্কগুলো রক্ষা করতে গিয়ে পেশাদারি বজায় রাখা বেশ কঠিন হয়ে ওঠে।
কর্মক্ষেত্রে একজন ভালো বন্ধু থাকলে কাজের প্রতি আগ্রহ এবং তৃপ্তি দুটিই অনেক বাড়ে। কর্মক্ষেত্রের বন্ধু কেবল একাকিত্বই দূর করে না, বরং মানসিক সাহস জোগায়। সহকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে কাজের জায়গায় পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ হয়, নতুন নতুন চিন্তা তৈরি হয় এবং কাজের গতি বাড়ে। প্রতিষ্ঠানের জন্যও এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। যেসব কর্মী কর্মপরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তাঁরা সাধারণত সহজে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান না। একতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ একটি ভালো কাজের পরিবেশ তৈরি করে, যা দিন শেষে প্রতিষ্ঠানের সফলতাই বৃদ্ধি করে।
কর্মক্ষেত্রের বন্ধু যতই কাছের হোক না কেন, ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে পেশাগত জীবনের একটি স্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। ব্যক্তিগত জীবনের সব গভীর গোপন কথা বা চরম ব্যক্তিগত বিষয় অফিসে শেয়ার না করাই ভালো। তেমনিভাবে, কর্মক্ষেত্রের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা উচিত। কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে চলুন। বন্ধু বলে তাঁকে কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। এতে দলের বাকি সদস্যদের মনোবল ভেঙে যায় এবং বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। পদমর্যাদার কারণে জানা প্রতিষ্ঠানের কোনো গোপন বা স্পর্শকাতর তথ্য বন্ধুকৃত সহকর্মীকেও বলা উচিত নয়। কাজের সময়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিন। অফিসে কাজের জায়গায় অতিরিক্ত ব্যক্তিগত আড্ডা বা সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সহকর্মীদের নিয়ে গসিপ বা গুজবে অংশ নেওয়া যাবে না। কোনো মতপার্থক্য তৈরি হলে তা নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেলা উচিত।
বন্ধুকে পরিচালনা করা বা তার বস হিসেবে কাজ করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে যখন কোনো বন্ধুকে কাজের ভুল নিয়ে মতামত বা ফিডব্যাক দিতে হয়, তখন সম্পর্ক ও পেশা মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে শুরুতেই খোলামেলা আলোচনা করে নেওয়া ভালো। বন্ধুকে বুঝিয়ে বলতে হবে, অফিসের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বন্ধুর পরিচয়ের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ এবং দলের সততাই মুখ্য। বন্ধু হিসেবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঠিক রেখেও কাজের জায়গায় সমান নিয়ম প্রযোজ্য। এই মানসিকতা পরিষ্কার থাকা দরকার।
অফিসে একটি ভালো বন্ধুত্ব মানসিক স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশের জন্য খুবই ইতিবাচক। তবে এই বন্ধুত্বের কারণে যেন আপনার পেশাগত দক্ষতা বা সুনামের কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। পেশাদারি, পারস্পরিক সম্মান এবং সঠিক সীমানা বজায় রেখে চললে কর্মক্ষেত্রের বন্ধুত্ব জীবনকে আরও সুন্দর ও সহজ করে তোলে। অফিসে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মীদের মধ্যে সরাসরি বন্ধুর চেয়ে মেন্টরশিপ বা অভিজ্ঞদের নির্দেশনামূলক সম্পর্ক তৈরি করা অনেক বেশি কার্যকর। এটি প্রতিষ্ঠানের সততা বজায় রাখে এবং নতুনদের কাজ শিখতে সাহায্য করে। বিভিন্ন প্রজন্ম বা অভিজ্ঞতার কর্মীদের মধ্যে সঠিক যোগাযোগের সুযোগ করে দিলে তা কাজের মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।
সূত্র: ফোর্বস, দ্য কনভারসেশন