আজকের ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। বর্তমানে এটি কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাপনের ধরনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। বিউটি টিউটরিয়াল দেখা কিংবা প্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারের ব্যবহৃত মেকআপসামগ্রী কেনা, এসবই যেন এখন বয়ঃসন্ধিকালের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে পর্দার এই ঝলমলে দুনিয়ার পেছনে আড়াল হয়ে যাচ্ছে এক বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিউটি কনটেন্ট দেখার প্রবণতা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রসাধন ও রূপচর্চার সামগ্রী ব্যবহারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এটি তাদের না জেনেই ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে ঠেলে দিচ্ছে।
আমেরিকার রুটগার্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এমিলি ব্যারেটের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় এমন ফলাফল উঠে এসেছে। এটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার জন্য নিউজার্সির প্রিন্সটন হাইস্কুলের ১৪৩ শিক্ষার্থীর ওপর এই পাইলট স্টাডিটি চালানো হয়। গবেষণায় দেখা যায়, কিশোরী মেয়েরা গড়ে দৈনিক ১৪টি করে প্রসাধন ও রূপচর্চার সামগ্রী ব্যবহার করে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ব্যবহারের হারের সমান। অন্যদিকে কিশোর ছেলেরা ব্যবহার করে এর প্রায় অর্ধেক। টুথপেস্ট, শ্যাম্পু বা সাবানের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরে পারফিউম, সানস্ক্রিন এবং মেকআপ প্রোডাক্ট ব্যবহারের পরিমাণ এই বয়সীদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো বেশি।
গবেষণায় স্পষ্ট উঠে এসেছে, কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া এই পণ্যগুলোর ব্যবহার বাড়াতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের লিঙ্গ, বয়স বা পারিবারিক শিক্ষার মতো বিষয়গুলো সামঞ্জস্য করার পরও দেখা গেছে, যারা রূপচর্চা বা চুলের যত্নের টিউটরিয়াল দেখে, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি প্রসাধন ব্যবহার করে। অন্যদিকে যেসব কিশোর-কিশোরী নিজস্ব প্রসাধন ব্র্যান্ড চালু করা বা প্রচার করা জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারদের অনুকরণ করে, তাদের ক্ষেত্রে এই ব্যবহারের হার ৩০ শতাংশ বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এসব প্রসাধনসামগ্রীতে লুকিয়ে থাকা থ্যালেটস, প্যারাবেনস এবং ফেনলসের মতো ক্ষতিকর উপাদান। এগুলো মূলত ‘এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর’ বা শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী রাসায়নিক। বয়ঃসন্ধিকাল এমনিতেই মানবদেহের হরমোনজনিত পরিবর্তনের এক সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে নিয়মিত এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা প্রজনন স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক সময়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দৈনিক এত পরিমাণ কসমেটিকস ব্যবহার করলেও লেবেল বা উপাদানের তালিকা পড়ার ক্ষেত্রে এই তরুণেরা চরম উদাসীন। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রসাধনের পেছনের উপাদানের তালিকা নিয়মিত পড়ে দেখে। আর নিরাপদ বিকল্প বা ক্ষতিকর রাসায়নিক শনাক্ত করতে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া ‘ন্যাচারাল’, ‘অরগানিক’ বা ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’র মতো বাজারজাতকরণ শব্দ ব্যবহার করে তৈরি করা বিজ্ঞাপনী চমকে (গ্রিন ওয়াশিং) খুব সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গবেষণার মূল চালিকাশক্তি অধ্যাপক এমিলি ব্যারেট উল্লেখ করেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হলেও, অনিয়ন্ত্রিত প্রসাধন ব্যবহারের মাধ্যমে তারা কীভাবে রাসায়নিকের ঝুঁকিতে পড়ছে, তা এই গবেষণায় স্পষ্ট। রুটগার্স ইউনিভার্সিটির গবেষক দলটি ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে অঞ্চলভিত্তিক কিশোর-কিশোরীদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে রাসায়নিকের সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি পরিমাপ করার পরিকল্পনা করছে।
ইনফ্লুয়েন্সারদের ঝলমলে দুনিয়া আর অ্যালগরিদমের মোহে পড়ে না বুঝে অতিরিক্ত প্রসাধন ব্যবহারের এই প্রবণতা এখনই থামানো জরুরি। পণ্য কেনার আগে মোড়কের উপাদানের তালিকা দেখা এবং প্রসাধনের ক্ষতিকর দিক নিয়ে অভিভাবক ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলাই হতে পারে এই রাসায়নিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার প্রথম পদক্ষেপ।
সূত্র: হেলথ লাইন, দ্য চোসুনিলবো