হোম > জীবনধারা > ফিচার

ভাষা পাল্টালেই বদলে যায় ব্যক্তিত্ব, জেনে নিন ভাষা যেভাবে বদলে দেয় আপনাকে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

কোনো ভাষায় কথা বলার সময় শুধু শব্দের পরিবর্তন ঘটে না, বদলে যায় আমাদের ভেতরের মানুষটাও। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার অন্যতম মাধ্যম ভাষা। অনেকে বলেন, ঝগড়া করার সময় নাকি মাতৃভাষায় ঝগড়া করতেই বেশি শান্তি পাওয়া যায়। এমন অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের ভাষা বা কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে বেশি পছন্দ করি। তাই প্রশ্ন আসতেই পারে, আমরা যখন অন্য কোনো ভাষায় কথা বলি, তখন কি শুধু শব্দের পরিবর্তন ঘটে, নাকি বদলে যায় আমাদের ভেতরের মানুষটাও? কেউ হয়তো বাংলায় অত্যন্ত ভালো ও বন্ধুপরায়ণ। কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলার সময় তাঁকে মনে হয় বেশ পেশাদার ও গম্ভীর। আবার গ্রিক বা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলার সময় সেই মানুষটিই হয়ে ওঠেন দারুণ প্রাণবন্ত ও আবেগপ্রবণ।

আবেগ ও মাতৃভাষার গভীর সম্পর্ক

একটি নতুন ভাষা শেখা মানে শুধু ব্যাকরণ মুখস্থ করা নয়। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নতুন এক সত্তা জাগিয়ে তোলে। ছবি: পেক্সেলস

আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কোন ভাষা ব্যবহার করছি, তা আমাদের আবেগ প্রক্রিয়াকরণে বড় ভূমিকা রাখে। মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। শৈশবের স্মৃতি, রাগ বা ভালোবাসার অনুভূতির তীব্রতা মাতৃভাষাতেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বা অর্জিত ভাষা মানুষকে একধরনের ‘আবেগীয় দূরত্ব’ দেয়। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি ও ডায়াগনস্টিক ইমিউনোলজির পরিচালক বার্কলে প্রফেসর ইমেরিটাস সুসান এরভিন-ত্রিপের একটি ঐতিহাসিক গবেষণার কথা ধরা যাক। তিনি জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নারীদের ওপর একটি পরীক্ষা চালান। সেখানে একটি বাক্যের অসম্পূর্ণ অংশ পূর্ণ করতে বলা হয়েছিল। যখন বাক্যটি জাপানি ভাষায় দেওয়া হলো, ‘পরিবারের সঙ্গে আমার ইচ্ছার বিরোধ হলে...’, তখন অংশগ্রহণকারীরা লিখেছিলেন ‘...তা বড়ই দুঃখের সময়।’ কিন্তু একই বাক্য যখন ইংরেজিতে দেওয়া হলো, তাঁরা লিখেছিলেন, ‘...আমি যা ভালো মনে করি, তা-ই করি।’ অর্থাৎ, ভাষা শুধু মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও অনুভূতির তীব্রতাকেও প্রভাবিত করে।

সংস্কৃতি নাকি ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন

ভেবে দেখুন তো, ভাষা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিত্বের এই পরিবর্তন কি সত্যিই নতুন কোনো আত্মার জন্ম দেয়? নাকি এটি শুধু ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার একটি উপায়? বারুক কলেজের অধ্যাপক ডেভিড লুনা এবং তাঁর সহকর্মীরা হিস্প্যানিক আমেরিকান নারীদের ওপর একটি গবেষণা চালান। স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলার সময় তাঁরা নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও বহির্মুখী হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলার সময় তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি ঐতিহ্যবাহী ও পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, একে সরাসরি ‘ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন’ না বলে ‘সাংস্কৃতিক অভিযোজন’ বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। আমরা একজন বন্ধুর সঙ্গে যে ভঙ্গিতে কথা বলি, কর্মক্ষেত্রে বসের সঙ্গে সেভাবে বলি না। ঠিক তেমনি এক-একটি ভাষা তার পেছনের কালচার বা সংস্কৃতিকে বহন করে। কোরিয়ান ভাষা যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে কিছুটা বিনয়ী ও সতর্ক করে তোলে। তেমনি ফরাসি ভাষা মানুষকে করে তোলে একটু বেশি প্রাণবন্ত ও আবেগপূর্ণ।

নতুন ভাষায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার

অভিজ্ঞ মানুষেরা মনে করেন, একটি নতুন ভাষা শেখা মানে শুধু ব্যাকরণ মুখস্থ করা নয়। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নতুন এক সত্তা জাগিয়ে তোলেন। নতুন ভাষায় নিজের একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে কয়েকটি চর্চা সাহায্য করতে পারে।

  • প্রতিটি ভাষারই নিজস্ব সংগীত রয়েছে। সেই ছন্দ অনুকরণ করলে কথা বলার ভঙ্গি ও আত্মবিশ্বাস বদলে যায়।
  • কোরিয়ান ভাষায় কথা বলার সময় সামান্য ঝুঁকে সম্মান প্রদর্শন কিংবা ইতালীয় ভাষায় হাত নেড়ে ভাব প্রকাশ করার মতো শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ভাষার সঙ্গে আবেগীয় সংযোগ বাড়ায়।
  • আনুষ্ঠানিক জায়গা, সৃজনশীল কাজ কিংবা বন্ধুদের আড্ডার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাষাকে মানসিকভাবে বেছে নিলে ভাষায় নিজস্ব ‘রোল’ বা চরিত্র স্পষ্ট হয়।

ভাষা শিক্ষার এই পথচলা মূলত নিজেকে জানার আরেকটি নতুন পথ। পরে যখনই আপনি নতুন কোনো ভাষায় কথা বলবেন, নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন, ‘এই ভাষায় কথা বলার সময় আমি আসলে কে হয়ে উঠছি?’ উত্তরটা হয়তো আপনাকে নতুন করে চমকে দিতে পারে।

সূত্র: দ্য কনভারসেশন, মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে