হোম > জীবনধারা > ফিচার

জাপানিদের দীর্ঘায়ুর রহস্য জানেন কি

ফিচার ডেস্ক

জাপানের মানুষ শতবর্ষ পার করেও দিব্যি হেঁটে চলেছেন, হাসিমুখে উপভোগ করছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। দেশটির সর্বজনীন ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা প্রবীণদের দীর্ঘায়ু লাভে বড় ভূমিকা রাখছে। ছবি: পেক্সেলস

বিশ্বের বুকে সুস্বাস্থ্য আর দীর্ঘায়ুর এক রূপকথার নাম জাপান। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে ষাট কিংবা সত্তর পেরোলেই বার্ধক্যের ছাপ আর নানান রোগ মানুষকে কাবু করে ফেলে। কিন্তু সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে ১০০ বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়াটাও এখন যেন এক নিয়মিত উদ্‌যাপনের গল্প। দেশটিতে শতবর্ষী বা সেঞ্চুরিয়ান মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কী এমন জাদু আছে এই দ্বীপরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রায়? কেন শতবর্ষ পার করেও তাঁরা দিব্যি হেঁটে চলেছেন, হাসিমুখে উপভোগ করছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত? উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁদের দৈনন্দিন খাবারের থালা, জীবনের দর্শন এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসের ভেতর।

জাপান তাদের দীর্ঘায়ুর ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড গড়েছে। সম্প্রতি দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ১ লাখের কোটা ছাড়িয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে পৌঁছেছে। টানা ৫৬ বছরের মতো দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।

খাবারের থালায় স্বাস্থ্যের মূলমন্ত্র

জাপানিদের দীর্ঘ জীবনের ভিত্তি পরিমিত ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস। পশ্চিমাদের মতো চর্বিযুক্ত বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার তাঁদের থালায় খুব একটা জায়গা পায় না। জাপানিদের প্রধান খাবার সামুদ্রিক মাছ, নানা পদের শাকসবজি, সয়া পণ্য (যেমন টফু, মিসো) এবং ভাত। মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। দেশটিতে একটি প্রচলিত প্রাচীন প্রবাদ আছে, ‘হারা হাচি বু’। এর অর্থ হলো, পেট ১০০ ভাগ না ভরিয়ে সব সময় ৮০ ভাগ পূর্ণ হওয়া মাত্র খাওয়া থামিয়ে দেওয়া। এই অভ্যাসের ফলে পরিপাকতন্ত্র অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে না। এতে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

আনন্দের দর্শন: ইকিগাই

জাপানিদের কাছে দীর্ঘ জীবন মানে স্রেফ বেঁচে থাকা নয়, বরং বেঁচে থাকার একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকা। একে তাঁরা বলেন ইকিগাই। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পেছনে প্রত্যেকের একটি লক্ষ্য বা আনন্দ থাকে। সেটি হতে পারে নাতি-নাতনিকে নিয়ে আনন্দ করা, বাগানের পরিচর্যা কিংবা কোনো শখ পূরণ করা। অবসরে গিয়ে অলস বসে থাকার সংস্কৃতি জাপানে নেই বললেই চলে। মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজেকে প্রয়োজনীয় ভাবার এই প্রবণতা প্রবীণদের বিষণ্নতা ও আলঝেইমারের মতো মানসিক রোগ থেকে দূরে রাখে।

জাপানের প্রবীণদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁরা আলাদা করে জিমে যান না, কিন্তু সারা দিনই কোনো না কোনো শারীরিক শ্রমে যুক্ত থাকেন। ছবি: পেক্সেলস

অলসতামুক্ত প্রতিদিনের জীবন

জাপানের প্রবীণদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁরা আলাদা করে জিমে যান না, কিন্তু সারা দিনই কোনো না কোনো শারীরিক শ্রমে যুক্ত থাকেন। গাড়ি ব্যবহার করার চেয়ে তাঁরা হেঁটে বাজারে যেতে, বাস বা ট্রেনে যাতায়াত করতে কিংবা সাইকেল চালাতে বেশি পছন্দ করেন। সকালে রেডিও তাইসো টিউন করে সংগীতের তালে ৩ মিনিটের হালকা স্ট্রেচিং বা রিদমিক শরীরচর্চা করা জাপানের ঘরে ঘরে এক অতি পরিচিত দৃশ্য এখন।

সবার জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা

জাপানের সর্বজনীন ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা প্রবীণদের দীর্ঘায়ু লাভে বড় ভূমিকা রাখছে। সেখানে নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক এবং অত্যন্ত সহজলভ্য। ফলে যেকোনো বড় রোগ শুরুতে ধরা পড়ে এবং সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।

মুদ্রার অন্য পিঠ

দীর্ঘায়ুর এই অভাবনীয় জয়গান শুনে চমকে উঠলেও, এই অর্জনের আড়ালে জমা হচ্ছে এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিন্তা। শতবর্ষীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও জাপানে নতুন শিশুর জন্মহার একদম তলানিতে এসে ঠেকেছে। প্রবীণদের যত্ন নেওয়ার মতো তরুণ কর্মক্ষম মানুষের সংকট দেখা দেওয়ায় দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তবুও সব সংকটকে একপাশে রেখে যদি শুধু সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের সমীকরণ মেলাতে হয়, তবে জাপানিদের সুষম খাদ্যাভ্যাস, আত্মিক শান্তি এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাত্রা আজও পুরো পৃথিবীর জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

সূত্র: বিবিসি, সিএনএন, দ্য জাপান টাইমস