সকালে এক কাপ গরম চা বা কফি। অনেকের কাছে এটাই দিনটা চমৎকার কেটে যাওয়ার একটা দারুণ শুরু বলে মনে হয়। এই এক কাপ গরম পানীয় দিয়ে দিন শুরু করা আমাদের অনেকের নিত্যদিনের অভ্যাস। বিশেষ করে শীতের দিনে ধোঁয়া ওঠা পানীয় শরীরে এক মুহূর্তে চাঙা ভাব এনে দেয়। কিন্তু এই আনন্দদায়ক অভ্যাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে এক বড় বিপদ। অতি মাত্রায় গরম চা, কফি বা যেকোনো পানীয় নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালি বা গ্রাসনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রায় ১০ লাখ (৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৮২ জন) মধ্যবয়সী মানুষের ওপর দীর্ঘ ১০ থেকে ১৪ বছর ধরে একটি পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এসেছেন। তার ফল সম্প্রতি তাঁরা প্রকাশ করেছেন। আর সেখানেই উঠে এসেছে এই গরম চা কিংবা কফির এক ভয়ংকর দিক। গবেষণার ফল অনুযায়ী, যাঁরা নিয়মিত ‘খুব গরম’ পানীয় পান করেন, তাঁদের খাদ্যনালির ক্যানসার বা ‘স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা’-তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর এই ঝুঁকি সাধারণ বা হালকা গরম পানীয় পানকারীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি হয়।
বিপদ কিন্তু চা বা কফিতে নয়। বিপদটা আসলে এর তাপমাত্রায়। গবেষকদের মতে, সমস্যাটি চা বা কফির উপাদানে নয়। তারা বলছে আসল সমস্যা পানীয়ের অতিরিক্ত তাপমাত্রায়। আন্তর্জাতিক কর্কট গবেষণা সংস্থার মতে, ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার যেকোনো পানীয় মানবদেহের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হতে পারে। সাধারণত কেটলিতে ফুটানো পানির তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। কাপে ঢালার পরও তা ৯০ থেকে ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। এই ধোঁয়া ওঠা তরল যখন পান করা হয়, তখন আমাদের জিব বা মুখ তাপ অনুভব করলেও খাদ্যনালিতে যন্ত্রণার অনুভূতি বোঝার মতো রিসেপ্টর কম থাকে। ফলে আমরা বুঝতে না পারলেও অতি গরম তরল নেমে যাওয়ার সময় খাদ্যনালির ভেতরের পাতলা কোষগুলোকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়ায় খাদ্যনালিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়। এই প্রদাহ ক্যানসারের কোষ তৈরিতে সহায়তা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দিনে ৬ কাপ বা তার বেশি গরম পানীয় পান করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় ৭১ শতাংশ বেড়ে যায়। এমন অনেকে ভাবেন, গরম চায়ে দুধ মেশালে হয়তো তাপমাত্রা কমে যায়। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, দুধ মেশানোর পরও পানীয়টি খাদ্যনালির জন্য সহনশীল মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি গরম থেকে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্য শুনে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও স্থূলতা, এসব ক্যানসারের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এগুলো এড়িয়ে চলা সবচেয়ে জরুরি। আর গরম পানীয় পানের ক্ষেত্রে শুধু একটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলাই যথেষ্ট।
চা বা কফি কাপে ঢালার পর সরাসরি মুখে না তুলে অন্তত ৩ থেকে ৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এর তাপমাত্রা সহনশীল পর্যায়ে নেমে এলে এরপর পান করুন। এককথায়, যে পানীয় জিহ্বায় দিলে অস্বস্তি হয়, তা খাদ্যনালির ক্ষতি করছে। তাই সামান্য জুড়িয়ে চা-কফি পান করলে স্বাদও মিলবে, আবার স্বাস্থ্যঝুঁকিও এড়ানো যাবে।
সূত্র: বিবিসি, হেলথলাইন