হোম > জীবনধারা > ফিচার

মাকড়সার জাল থেকে বিশ্বমঞ্চে ঘানার কাপড় ‘কেন্তে’ ও ‘ফুগু’

ফিচার ডেস্ক

একসময় কেন্তে বোনা হতো শুধু রাজা-বাদশাহদের জন্য এবং পবিত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পোশাক হিসেবে। ছবি: পেক্সেলস

বাঙালি আর দূর আফ্রিকার দেশ ঘানার মানুষের মধ্যে একটা বিষয়ে খানিকটা মিল আছে। চমকে ওঠার কিছু নেই। শীতলক্ষ্যাতীরের মানুষ যেমন সুদীর্ঘ সময় ধরে তাঁতে বুনে চলেছেন জামদানি কাপড়, ঘানার মানুষও তেমনি তাঁতের ফ্রেমে রঙিন সুতায় বুনে চলেছেন নিজেদের ইতিহাস। ঘানার ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের গল্পটা শুধু সুতা দিয়ে কাপড় বোনার নয়, এটি আসলে কাপড়ের ভাষায় প্রবাদ, আভিজাত্য আর সামাজিক পরিচয় ফুটিয়ে তোলার আখ্যান। বিশ্বখ্যাত এই কাপড়ের নাম ‘কেন্তে’। আর উত্তরের রুক্ষ আবহাওয়ায় তার এক ভাই আছে, নাম ‘ফুগু’।

মাকড়সার জাল থেকে রাজকীয় অবস্থান

আমাদের মসলিনের যেমন আছে এক দারুণ কিংবদন্তি, কেন্তের জন্মের পেছনেও রয়েছে তেমনই এক চমৎকার রূপকথা। বলা হয়, শত শত বছর আগে আশান্তি নামের একটি অঞ্চলের বোনওয়ার গ্রামের দুই ভাই একবার বনে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা একটি মাকড়সার নিখুঁত জাল বোনা দেখে মুগ্ধ হন। বাড়ি ফিরে তাঁরা রাফিয়া নামের একধরনের পামগাছের পাতা থেকে তৈরি সুতা দিয়ে সেই জালের নকশা নকলের চেষ্টা করেন। সেখান থেকে জন্ম নেয় কেন্তে। একসময় এটি বোনা হতো শুধু রাজা-বাদশাহদের জন্য এবং পবিত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পোশাক হিসেবে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি পরা নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি রাজাদেরও মেপে মেপে বেছে নিতে হতো কোন অনুষ্ঠানে কোন নকশাটি পরবেন। কালের বিবর্তনে রেশম, তুলা এবং রেয়নের সুতোয় অনুভূমিক তাঁতের সাহায্যে কেন্তের বুননপদ্ধতি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

কালের বিবর্তনে রেশম, তুলা এবং রেয়নের সুতোয় অনুভূমিক তাঁতের সাহায্যে কেন্তের বুনন পদ্ধতি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। ছবি: দ্য ফ্যাশন গ্লোব

আশান্তি, এউই এবং উত্তরের মেলবন্ধন

ঘানার তাঁতশিল্প শুধু এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের যেমন টাঙ্গাইল, পাবনা বা ঢাকাই জামদানির নিজস্ব ঘরানা আছে। ঘানাতেও অঞ্চলভেদে তাঁতের বুননে রয়েছে বিস্তর তফাত। আশান্তি অঞ্চলের কেন্তে আভিজাত্য, রাজকীয়তা এবং নিখুঁত জ্যামিতিক নকশার জন্য বিখ্যাত। আবার ভোল্টা অঞ্চলের ‘এউই কেন্তে’ একটু ভিন্ন। এখানকার আগোটিমে-কপেতোয়ে শহরকে এই বুননের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়। আশান্তি এলাকার মতো ভোল্টা এলাকার এউই কেন্তে শুধু রাজাদের ব্যবহার্য ছিল না। এর বিশেষত্ব হলো, এই কাপড়ের মাঝে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতি বা চেয়ারের মতো বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়, যা কাপড়ে একেকটি গল্প বা কবিতার মতো রূপ নেয়।

আজকের কেন্তে আর শুধু ঘানার উৎসবের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্বমঞ্চের ফ্যাশন রানওয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

উত্তরের ঐতিহ্য ‘ফুগু’। দাগোম্বা, মামপ্রুসি বা ফ্রাফ্রা উপজাতির মানুষ কিছুটা চওড়া তাঁতে মোটা সুতা দিয়ে এই কাপড় বোনে। উত্তরের ঠান্ডা আবহাওয়ার উপযোগী এই কাপড় দিয়ে তৈরি হয় ‘বাতাকারি’ নামক একধরনের ঢিলেঢালা পোশাক পুরুষত্ব ও সম্মানের প্রতীক। অতীতে যুদ্ধে ক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য এই পোশাকে তাবিজও সেলাই করে রাখা হতো।

প্রবাদ যখন কথা বলে

ঘানার তাঁতিরা কাপড়ে শুধু রং ছড়ান না, তাঁরা কাপড়ের নামকরণ করেন সমাজের বিভিন্ন পরিস্থিতি, প্রবাদ কিংবা দর্শন দিয়ে। এউই কেন্তের কিছু কাপড়ের নাম শুনলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেমন একধরনের কাপড়ের নাম ত্রিতরিকু। এর অর্থ ‘কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়’। আগবেমেভোর নামের অর্থ ‘জীবনের চাদর’। কাপড়ের গাবুসু নামের অর্থ ‘একতাই শক্তি’। রঙের ব্যবহারেও রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। নীল রং শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলে, লাল প্রকাশ করে সংগ্রাম, সবুজ মানে সমৃদ্ধি ও কৃষি, আর সাদা হলো পবিত্রতা ও বিজয়ের প্রতীক। ক্রেতার বয়স, লিঙ্গ ও সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে এই রং ও নকশা নির্ধারিত হয়।

কাজের ভাগ ও বুনন শিক্ষা

ঘানার এই তাঁতশিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়া বেশ সুশৃঙ্খল। সাধারণত পুরুষ ও নারী—উভয়ে এই কর্মযজ্ঞের অংশ। নারীরা মূলত তুলা থেকে সুতা তৈরির দায়িত্বে থাকেন। অন্যদিকে পুরুষেরা তাঁত এবং এর আনুষঙ্গিক কাঠামোগত যন্ত্রপাতি তৈরি করেন। প্রতিটি উৎপাদনকারী সম্প্রদায় পরিচালিত হয় একজন চিফ ওয়েভার বা প্রধান তাঁতির মাধ্যমে, যিনি কাপড়ের মান নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে তাঁতিদের ভেতরের কোন্দল মেটানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের কাজ করেন। এই বিদ্যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির মাধ্যমে নয়, বরং পরিবারের ভেতরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বা ওস্তাদের অধীনে শিক্ষানবিশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে আধুনিক সময়ে হাইস্কুল ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এই শিল্পকলা শেখানো হচ্ছে।

আজকের কেন্তে আর শুধু ঘানার উৎসবের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্বমঞ্চের ফ্যাশন রানওয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক বিশ্বের হাতছানি ও অস্তিত্বের সংকট

আজকের কেন্তে আর শুধু ঘানার উৎসবের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্বমঞ্চের ফ্যাশন রানওয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ঘানার রাষ্ট্রপতি জন দ্রামানি মাহামার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে হলিউডের সেলিব্রিটিদের কাঁধ হয়ে এটি এখন বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ও কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির গৌরবের প্রতীক। কিন্তু এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে এক বড় সংকট। চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মেশিনে তৈরি সস্তা প্রিন্টেড সিনথেটিক কেন্তে বাজারে চলে আসায় তাঁতিদের হাতে বোনা আসল কেন্তে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। এর সুতা তৈরির জন্য এখন আমদানি করা তুলার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বিশ্ববাজারে তালার দাম বাড়লে তাঁতিদের খরচ অনেক বেড়ে যায়। প্রবীণ তাঁতিরা জানিয়েছেন, নতুন প্রজন্ম এখন অফিস-আদালতের কাজের দিকে ঝুঁকছে। ভিজ্যুয়াল আর্টসের শিক্ষার্থীরা যে বয়সে হাইস্কুলে গিয়ে এই কাজ শেখে, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে যায়; বুননটা ছোটবেলা থেকে রক্তে মিশতে হয়।

ঐতিহ্য বাঁচানোর লড়াই

এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ভারতের সনাতন টেক্সটাইল সার্টিফিকেশনের মতো ঘানাতেও আসল হাতে বোনা কাপড় চেনার জন্য বিশেষ সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চালুর চেষ্টা চলছে। কারণ, কেন্তে বা ফুগু শুধু সুতার জটলা নয়, এটি কাপড়ের ক্যানভাসে বোনা ঘানার একেকটি বাঁকবদলের জীবন্ত ইতিহাস। প্রবীণ তাঁতিদের ভাষায়, ‘আমাদের এই ঐতিহ্য রক্ষা করতেই হবে। নয়তো পরবর্তী প্রজন্ম একদিন শুধু জাদুঘরের কাচের বাক্সে রাখা প্রদর্শনীতেই কেন্তের অস্তিত্ব খুঁজে পাবে।’

সূত্র: ঘানা ওয়েভ, দ্য ফ্যাশন গ্লোব

জাপানিদের পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে

নব্বই মিনিটের বাইরে ফুটবল তারকাদের জীবনের সেরা ‘হোম টিম’

রাতে খেলা দেখে সকালে অফিসে ঝিমুনি, জানুন চাঙা থাকার উপায়

তুর্কি কফি-কাপের তলানিতে সত্যিই কি লেখা থাকে ভবিষ্যৎ

ফিলাডেলফিয়ার আইকনিক যে স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ব্রাজিল-হাইতি

মারাদোনিয়ান চার্চ: যেখানে দেবতা মারাদোনা, ধর্ম ফুটবল

বয়স ৫০-এর পর ফিট থাকতে চাই মনের জোর

ভুট্টায় ভাগ্যবদল! বিক্রেতা থেকে গ্লোবাল ক্রাশ তেমেল

প্রযুক্তির যেসব জাদু থাকছে এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চে

ভ্যাপসা গরমে ত্বক উজ্জ্বল ও সতেজ রাখতে করণীয়