চোখ, কান, নাক, জিব ও ত্বক—ছোটবেলা থেকে আমরা শিখে এসেছি এই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ বাইরের পৃথিবীকে জানে এবং অনুধাবন করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় এক্সটেরোসেপশন বা বাহ্যিক অনুভূতি। খিদে লাগলে পেটে চোঁ-চোঁ অনুভূতি হয়। ভয়ে বা দুশ্চিন্তায় দ্রুত হৃৎস্পন্দন হয় কিংবা হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে ওঠে। কখনো ভেবে দেখেছেন, আমাদের শরীরের ভেতরে ঘটে যাওয়া অনুভূতিগুলো আমরা কীভাবে টের পাই? শরীরের ভেতরের এই সংকেতগুলো আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হয় ইন্টারোসেপশন বা অন্তঃসংবেদন। গবেষকেরা একেই বলছেন মানুষের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়।
সহজ কথায়, ইন্টারোসেপশন হলো শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে আসা সংকেতগুলো অনুধাবন এবং উপলব্ধি করার মানসিক ও স্নায়বিক ক্ষমতা। আমাদের মস্তিষ্ক শুধু বাইরের উদ্দীপনায় সাড়া দেয় না; বরং শরীরের ভেতরের ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিস বজায় রাখতে এই অভ্যন্তরীণ সংকেতগুলো প্রতিনিয়ত বিশ্লেষণ করে। যেমন অতিরিক্ত গরমে শরীর ঠান্ডা করা কিংবা রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। বেশির ভাগ সময় এই আদান-প্রদান অবচেতন মনেই ঘটে, তবে সচেতনভাবে ভেতরের এই অনুভূতি বুঝতে পারাকে বলা হয় ইন্টারোসেপ্টিভ অ্যাওয়ারনেস।
স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের পেছনে এই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ভূমিকা অপরিসীম।
বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন: বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে ইন্টারোসেপ্টিভ অ্যাওয়ারনেস বা ভেতরের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা কম থাকে। শরীর থেকে আসা সংকেত ঠিকমতো মস্তিষ্কে না পৌঁছানোয় তাঁরা একধরনের মানসিক অনুভূতি হীনতা ও অবসাদে ভোগেন।
দুশ্চিন্তা ও প্যানিক অ্যাটাক: বিপরীতভাবে, উদ্বেগ বা অ্যানজাইটিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের শারীরিক সংকেত নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হন। সামান্য দ্রুত হৃৎস্পন্দন হলেই তাঁরা বড় কোনো বিপদের আশঙ্কায় প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হন, যা অনেক সময় হৃদ্রোগের ভীতি তৈরি করে।
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা অনুভূতি প্রকাশ: আমাদের যেকোনো আবেগ তৈরি হওয়ার আগে শরীরে তার প্রতিক্রিয়া ঘটে। বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখলে শরীর আগে সাড়া দেয়। এ ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দন বাড়ে, পেশি শক্ত হয়। এরপর মস্তিষ্ক তা অনুধাবন করে ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে। যাঁরা শরীরের এই প্রাথমিক ভাষা বুঝতে পারেন, তাঁরা আবেগ নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি দক্ষ হন।
ইন্টারোসেপশন মানুষের অন্তর্দৃষ্টি বা সিক্সথ সেন্স হিসেবে কাজ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। তবে কখনো কখনো এটি বৈষম্য বা পক্ষপাতিত্বও বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভয়ের কারণে হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলে মানুষ বাইরের বিশ্বকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে। উদাহরণ হিসেবে, ভয়ের মুহূর্তে মানুষ সাধারণ কোনো বস্তুকেও অস্ত্র ভেবে ভুল করতে পারেন। কারণ, তাঁর অভ্যন্তরীণ হৃৎস্পন্দন মস্তিষ্কের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
মস্তিষ্ককে দেহের চালিকাশক্তির কেন্দ্র ভাবা হলেও ইন্টারোসেপশন প্রমাণ করছে, আমাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর সংকেতই মূলত মস্তিষ্কের চিন্তা ও আবেগকে চালিত করে। ভেতরের এই অদেখা জগৎ সঠিকভাবে চিনতে ও বুঝতে পারলে দুশ্চিন্তা কমবে। এর ফলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং জীবন হয়ে উঠবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ। পেশির মতোই প্রশিক্ষণ দিয়ে ইন্টারোসেপ্টিভ অ্যাওয়ারনেস বা সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি অনুশীলনের মাধ্যমে এটি চর্চা করা যায়।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, দ্য গার্ডিয়ান