মধ্যবয়স—শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে একটি নির্দিষ্ট বয়সের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বয়সটা ঠিক কত? ৩৫? ৪০? ৫০? নাকি ৬০? আশ্চর্যের বিষয়, এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কারণ মধ্যবয়সকে কেবল বয়স দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। বরং এটি জীবনের এমন একটি পর্যায়, যেখানে মানুষ একই সঙ্গে পেছনে ফিরে তাকায় এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিসাব কষে।
যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু প্রায় ৭৯ বছর। সেই হিসাবে জীবনের গাণিতিক মধ্যবিন্দু ৩৯ দশমিক ৫ বছর। কিন্তু ৪০ বছর বয়সে পৌঁছানো মানেই কি মধ্যবয়সে প্রবেশ? জরিপগুলো কিন্তু এই বিষয়ে একমত নয়। একটি জরিপে মানুষ মধ্যবয়সের সময়কাল হিসেবে ৪০ থেকে ৬০ বছরকে চিহ্নিত করেছে। আবার একটি ব্রিটিশ জরিপে গড় উত্তরদাতারা বলেছেন, মধ্যবয়স শুরু হয় ৩৫ বছরে এবং শেষ হয় ৫৮ বছরে। এমনকি ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের একটি অংশও নিজেদের মধ্যবয়সী মনে করেন।
‘মধ্যবয়স’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী মার্গি ল্যাচম্যান। তিনি তাঁর গবেষণায় সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছরকে মধ্যবয়স হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে এর দুই পাশে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত তারতম্য থাকতে পারে। অর্থাৎ, মধ্যবয়সের সীমানাও আসলে বেশ অস্পষ্ট।
এর একটি কারণ হলো, মানুষ নিজের বয়সের ওপর ভিত্তি করে মধ্যবয়সের সংজ্ঞা বদলে ফেলে। বিশের কোঠায় থাকা মানুষ মনে করে মধ্যবয়স শুরু হয় প্রায় ৪০-এ। কিন্তু সত্তরের কোঠায় থাকা মানুষ মনে করতে পারেন, মধ্যবয়স শুরু হয়েছে ৪৮ বা ৪৯ বছরে এবং শেষ হয়েছে ৬২ থেকে ৬৫-এর মধ্যে। এর পেছনে বয়সবাদ বা তারুণ্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতিরও ভূমিকা রয়েছে। এমন এক সমাজে, যেখানে ‘বৃদ্ধ’ শব্দটির সঙ্গে নেতিবাচক ধারণা জড়িয়ে আছে, সেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে যত দিন সম্ভব তরুণ ভাবতে চায়।
আবার মধ্যবয়সকে ঘিরে ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ বা মধ্যজীবনের সংকটের ধারণাটিও এর ভাবমূর্তিকে জটিল করেছে। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, তথাকথিত মধ্যজীবনের সংকট সর্বজনীন কোনো বাস্তবতা নয়। অনেকের কাছে বরং এই সময়টি জীবনের সবচেয়ে অর্থবহ ও পরিণত পর্যায়।
আধুনিক পৃথিবীতে মানুষের আয়ু বাড়ছে, বিয়েও করছে কিছুটা দেরিতে, সন্তান নেওয়া বা বাড়ি কেনার মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোও পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রচলিত মাইলফলকগুলোও বদলে যাচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, ব্যায়াম ও ত্বকের যত্নের কারণে মানুষের চেহারাতেও বয়সের ছাপ আগের তুলনায় দেরিতে দেখা দিচ্ছে। ফলে বয়সের প্রচলিত ধারণাগুলো আরও অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ল্যাচম্যানের কাছে অবশ্য মধ্যবয়স কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। তাঁর মতে, মধ্যবয়সকে বোঝার ভালো উপায় হলো মানুষের জীবনের ভূমিকা ও দায়িত্বের দিকে তাকানো। এই সময়ে একজন মানুষ হয়তো সন্তানদের দেখাশোনা করছেন, একই সঙ্গে বয়স্ক বাবা-মায়ের দায়িত্বও নিচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি তরুণ সহকর্মীদের পরামর্শ দিচ্ছেন, আবার নিজের চেয়ে বয়স্কদের কাছ থেকেও শিখছেন। অর্থাৎ, তিনি সত্যিই জীবনের ‘মাঝখানে’ অবস্থান করছেন—যেখানে অন্যরা তাঁর ওপর নির্ভর করছে।
এই অর্থে মধ্যবয়স একই সঙ্গে ক্লান্তিকর এবং পরিপূর্ণতার সময়। মানুষ তখন জীবনের অনেক শিক্ষা অর্জন করেছে, আবার সামনে পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট সময়ও রয়েছে। তাই মধ্যবয়স হয়তো ক্যালেন্ডারের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়; বরং একটি অনুভূতি, যা ধীরে ধীরে আমাদের ভেতরে এসে বসে।
তবু যদি একটি সংখ্যা বেছে নিতেই হয়, ল্যাচম্যানের উত্তর—৪৫ থেকে ৬৫ বছর। তবে শেষ পর্যন্ত মধ্যবয়সের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞাটি হয়তো এটাই: জীবনের যে সময়ে মানুষ পেছনে তাকিয়ে নিজের পথকে বুঝতে পারে এবং সামনে তাকিয়ে নতুন পথ বেছে নেওয়ার সাহসও রাখে।
দ্য আটলান্টিক অবলম্বনে