চিকিৎসকের একটি সতর্কবার্তা আমূল বদলে দিয়েছিল দিল্লির দম্পতি রূপিকা আনন্দ ও রাকেশ আনন্দের জীবন। শারীরিক অসুস্থতা থেকে সুস্থ জীবনের খোঁজে শহরের আরাম-আয়েশ ও সফল করপোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন কৃষিকাজ। মাত্র দুই বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে ১৫ একরে। তাঁদের জৈব কৃষি ব্যবসার বার্ষিক আয়ও পৌঁছেছে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে।
স্টার্টআপপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে রূপিকা আনন্দের সারকয়ডোসিস ধরা পড়ে। এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে ফুসফুসকে আক্রান্ত করতে পারে এমন একটি প্রদাহজনিত রোগ। তাঁর ফুসফুসের অবস্থাও গুরুতর হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসকেরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর হাতে হয়তো আর মাত্র পাঁচ বছর সময় রয়েছে।
এই খবর রূপিকা ও তাঁর স্বামী রাকেশের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। এরপরই তাঁরা শহুরে জীবনযাপন ছেড়ে প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত থেকে তাঁদের জৈব কৃষির পথে যাত্রা।
কৃষিকাজে আসার আগে দুজনেরই ছিল সফল করপোরেট ক্যারিয়ার। থার্টিস্টেডসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআইটি বোম্বের স্নাতক রাকেশ দুবাইয়ে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। অন্যদিকে রূপিকা কর্মরত ছিলেন এমিরেটস ব্যাংকে।
কৃষিকাজে তাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ শেখার জন্য তাঁরা স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষকদের সহায়তা নেন। নয়ডায় দুই বিঘা জমিতে ছোট পরিসরে শুরু হয় তাঁদের পরীক্ষামূলক চাষাবাদ। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে তাঁদের উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় ‘অর্গানিক থিও’ নামে।
প্রথম দিকের ফসল ভালো হওয়ায় আত্মবিশ্বাস বাড়ে এই দম্পতির। ২০১৯ সালে তাঁরা দ্রুত চাষের পরিধি বাড়াতে শুরু করেন। কিন্তু প্রথমবার বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে ফসল বাজারজাত করার প্রস্তুতির মধ্যেই আসে করোনা মহামারি। লকডাউনে বাজার ও পরিবহনব্যবস্থা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে খেতের তাজা ফসল নষ্ট হতে না দিয়ে নিজেদের আবাসিক এলাকার মানুষের মধ্যে তা বিতরণ করতে শুরু করেন রূপিকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পাওয়া সাড়া ছিল অভাবনীয়। আর এই ঘটনাই তাঁদের ব্যবসার জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
বর্তমানে উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহর ও পিলখুয়ায় প্রায় ১৫ একর জমিতে বিস্তৃত হয়েছে তাঁদের জৈব কৃষি কার্যক্রম। সেখানে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, শস্য, ডাল, মিলেট, মসলা, ঔষধি ফসল ও ফল উৎপাদন করা হয়।
শুধু কৃষিপণ্যেই সীমাবদ্ধ নেই ‘অর্গানিক থিও’; নিজেদের খামারে উৎপাদিত উপাদান ব্যবহার করে তাঁরা কোল্ড-প্রেসড তেল, ঐতিহ্যবাহী আচার, দেশি গরুর ঘি, বিশেষ ধরনের আটা, কেচাপ, মধু এবং প্রিজারভেটিভমুক্ত ফলের ক্রিম তৈরি করছেন। এ ছাড়া পনির, খোয়া, বেকারি পণ্য, হারবাল পাউডার ও বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ওয়েলনেস পণ্যও রয়েছে তাঁদের তালিকায়।
স্টার্টআপপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের খামার থেকে বর্তমানে বছরে ৯ থেকে ১০ টন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। আর এসব পণ্য ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসা থেকে বছরে ৪৭ থেকে ৪৮ লাখ ভারতীয় রুপি আয় করছেন রূপিকা ও রাকেশ।
একসময় যে ভয়াবহ স্বাস্থ্যসংকট তাঁদের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে নতুন জীবনের সূচনা। করপোরেট দুনিয়া ছেড়ে প্রকৃতির কাছে ফেরা রূপিকা-রাকেশের ছোট্ট উদ্যোগ এখন ১৫ একরের সফল জৈব কৃষি ব্যবসা।