হোম > জীবনধারা > ফিচার

অন্ধকার শৈশব ও হ্যালুসিনেশন থেকে যে শিল্পের জন্ম

ফিচার ডেস্ক

প্যারিসে লুই ভিটঁ সদর দপ্তর এবং সামারিটাইন স্টোরের মাঝখানে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইয়ায়োই কুসামার একটি বিশাল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

জাপানের আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে অন্যতম নাম ইয়ায়োই কুসামা। ১৯২৯ সালে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী এ বছরের ১৪ আগস্ট ৯৭ বছর বয়সে টোকিওর একটি হাসপাতালে মারা যান। ‘পলকা ডটের রানি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন কুসামা। তিনি তাঁর কয়েক দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজের হ্যালুসিনেশন ও মানসিক আঘাতকে তাঁর সিগনেচার ডট, নেট বা জালের নকশা এবং অসীম মোটিফসমৃদ্ধ প্রাণবন্ত শিল্পকর্মে রূপ দিয়েছেন। শুধু দৃশ্যশিল্পেই নয়; চলচ্চিত্র, উপন্যাস ও কবিতার পাশাপাশি ফ্যাশন জগতেও কুসামা তাঁর সৃষ্টিশীলতার ছাপ রেখেছেন। বিখ্যাত বিলাসবহুল ব্র্যান্ড লুই লুই ভিটঁ-এর সঙ্গে তাঁর যৌথ কাজ ব্যাপক সমাদৃত হয়।

শিল্পের জন্ম যেখান থেকে

১৯২৯ সালে জাপানের মাতসুমোতো শহরে জন্ম নেন কুসামা। তাঁর শৈশব খুব একটা সুখকর ছিল না। সেখানে ছিল পারিবারিক অশান্তি, নির্যাতনসহ নানান প্রতিকূলতা। এর মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকে কুসামা এক অদ্ভুত মানসিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতেন। তাঁর ছিল বিভিন্ন ধরনের ভিজুয়াল ও অডিটরি হ্যালুসিনেশন, অর্থাৎ দৃষ্টি ও শ্রবণ বিভ্রম। একবার কুসামা একটি ফুলের খেতে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, ফুলগুলো তাঁর সঙ্গে কথা বলছে এবং চারপাশের সবকিছু ছোট ছোট বিন্দু বা ডটে পরিণত হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতায় তিনি অনুভব করতেন যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালতার মধ্যে তিনি নিজে বিলীন বা আত্ম-বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছেন। পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও তাঁর ছবি আঁকার অদম্য ইচ্ছা দমে যায়নি। মা আঁকা ছবি ছিঁড়ে ফেললে তিনি আবার নতুন করে আঁকতেন। রং কেনার টাকা না থাকলে কাদা আর পুরোনো বস্তা দিয়ে শিল্পকর্ম বানাতেন। ধীরে ধীরে মানসিক যন্ত্রণা ও বিভ্রম সামলানোর একমাত্র উপায় হিসেবে তিনি বেছে নেন তুলি আর ক্যানভাস।

নিউইয়র্কের দিনগুলো ও শিল্পবিপ্লব

শিল্পকলার জগতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করতে ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে কুসামা পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সেখানে শুরুতে ভাষা আর সংস্কৃতির নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও তিনি অনড় ছিলেন। পুরুষশাসিত ও বর্ণভিত্তিক পশ্চিমা শিল্প দুনিয়ায় একজন এশীয় নারী হিসেবে নানামুখী সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েও তিনি তাঁর মৌলিক শৈলী ধরে রাখেন। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি তৎকালীন বিখ্যাত পপ আর্ট এবং মিনিমালিজম ধারার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেন এবং বন্ধু হন। তাঁদের মধ্যে ছিল অ্যান্ডি ওয়ারহল, ডোনাল্ড জুড, জোসেফ কর্নেল প্রমুখ। এ সময় তিনি অ্যাকশন পেইন্টিং, পরিবেশন শিল্প এবং যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা হ্যাপেনিংসের মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দেন।

মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নতুন অধ্যায়

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে কুসামা জাপানে ফিরে যান। ১৯৭৭ সালে তিনি স্বেচ্ছায় টোকিওর একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। হাসপাতালের কাছেই ছিল তাঁর স্টুডিও, যেখানে প্রতিদিন সকালে গিয়ে তিনি নিরলসভাবে কাজ করতেন। জীবনের ভয়, উদ্বেগ আর যন্ত্রণা বিদায় জানানোর জন্য শিল্প সৃষ্টিকে তিনি একমাত্র ওষুধ মনে করতেন।

কুসামার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সমাদৃত এবং জনপ্রিয় সৃষ্টি হলো তাঁর এই ‘ইনফিনিটি রুম’ বা অসীম আয়নার ঘরগুলো। ছবি: সংগৃহীত

সমাদৃত ও উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম

কুসামার কাজগুলো বারবার ব্যবহৃত কিছু সুনির্দিষ্ট মোটিফের জন্য বিখ্যাত। যেমন পলকা ডট, নেট বা জালের নকশা, আয়না এবং পিনাকল বা ফ্যালিক আকৃতি।

ইনফিনিটি মিরর রুমস: কুসামার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সমাদৃত এবং জনপ্রিয় সৃষ্টি হলো তাঁর এই ‘ইনফিনিটি রুম’ বা অসীম আয়নার ঘরগুলো। ১৯৬৫ সালে শুরু করা এই বিশাল আকারের পরিবেশভিত্তিক শিল্পে হাজারো রংবেরঙের এলইডি আলো এবং আয়নার প্রতিফলনের মাধ্যমে একটি অসীম স্থানের বিভ্রম তৈরি করা হয়, যা দর্শককে সরাসরি কুসামার সেই শৈশবের আত্মবিলুপ্তির অনুভূতি এনে দেয়। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই ঘরগুলো দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

পলকা ডট ও পাম্পকিন স্কাল্পচার: ক্যানভাস, কাপড় কিংবা ভাস্কর্য—সবকিছুতে তাঁর ট্রেডমার্ক ছিল হরেক রঙের গোল ডট। এর পাশাপাশি বিশাল আকৃতির রঙিন কুমড়া ভাস্কর্যগুলোও অত্যন্ত সমাদৃত, যা জাপানের নাওশিমা দ্বীপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রদর্শিত হয়েছে।

ইনফিনিটি নেটস: ক্যানভাসজুড়ে জালের মতো পেঁচানো ও রিপিটেটিভ প্যাটার্নের এই পেইন্টিং সিরিজ দিয়ে তিনি নিউইয়র্কের শিল্পজগতে সাড়া ফেলেছিলেন।

নার্সিসাস গার্ডেন: ১৯৬৬ সালে ভেনিস বিয়েনালে না আমন্ত্রিত হয়েও তিনি ১ হাজার ৫০০টি চকচকে আয়নার বল ঘাসের ওপর সাজিয়ে প্রদর্শনী করেছিলেন এবং প্রতিটি বল ২ ডলারে বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়ে বাণিজ্যিক শিল্পধারার বিরুদ্ধে নিজস্ব স্টাইলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

কুসামার বিশাল আকৃতির রঙিন কুমড়া ভাস্কর্যগুলো অত্যন্ত সমাদৃত, যা জাপানের নাওশিমা দ্বীপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রদর্শিত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

সফট স্কাল্পচার ও ফ্যালিক আকৃতি

১৯৬১ থেকে ৬২ সালের মধ্যে তিনি কাপড়ের তৈরি বিভিন্ন আকৃতির সফট স্কাল্পচার বানানো শুরু করেন, যা সে সময় সেক্স বা যৌনতাসংক্রান্ত শৈশবের ভয় কাটাতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি বৈশ্বিক সুপারস্টারে পরিণত হন। ২০০৮ সালে তাঁর একটি চিত্রকর্ম ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০২২ সালে ‘আনটাইটেলড’ (নেটস) চিত্রকর্মটি প্রায় ১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ২০১৬ সালে তিনি জাপানের সর্বোচ্চ শিল্প সম্মাননা অর্ডার অব কালচার লাভ করেন।

জীবন সায়াহ্নে এসেও তাঁর মুখে ছিল সিগনেচার কমলা রঙের বব উইগ এবং পলকা ডটের পোশাক। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি ছবি এঁকেছেন। শারীরিক যন্ত্রণা আর মানসিক ভয় জয় করে কুসামা তৈরি করে গেছেন এমন এক শিল্পের জগৎ, যা যুগে যুগে মানুষকে অসীম ভালোবাসার আলো জুগিয়ে যাবে।

সূত্র: সিএনএন, আলজাজিরা, বিবিসি