সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন চারদিকে শুধু আশি ও নব্বইয়ের দশকের ছোঁয়া। রেট্রো ফিল্টার, ভিনটেজ আউটফিট কিংবা সেকালের পপ কালচারের ফটো ট্রেন্ডে মেতেছেন সব বয়সের মানুষ। তবে কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সেই সময়ের মানুষের কেবল ছবিগুলোই সুন্দর ছিল না, তাঁদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাও ছিল আজকের চেয়ে অনেক বেশি রোগমুক্ত, প্রাণবন্ত ও সতেজ?
ক্যামেরার ফিল্টারে নিজেকে নব্বইয়ের দশকের লুকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সেকালের সুপার হেলদি অভ্যাসগুলো দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনলে মিলতে পারে সুস্থতা।
- ঘরের খাবার: আশি-নব্বইয়ের দশকে আজকের মতো আলট্রা-প্রসেসড ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত স্ন্যাক্স বা প্রিজারভেটিভযুক্ত পানীয়ের সহজলভ্যতা ছিল না। প্রধান ভরসা ছিল ঘরের তৈরি তাজা খাবার, দেশি শাকসবজি এবং ফলমূল। ফলে তখনকার মানুষের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও স্থূলতার ঝুঁকি ছিল অনেক কম।
- ভেষজ ও রান্নাঘরের অ্যান্টিবায়োটিক: সেকালে সামান্য সর্দি, কাশি বা পেটের সমস্যাতেই হুট করে কেমিক্যালযুক্ত ওষুধ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। তুলসীপাতা, আদা, হলুদ, কালিজিরা ও নিমপাতার মতো ঘরোয়া উপাদানের ওপর মানুষের আস্থা ছিল বেশি। এতে পরিপাকতন্ত্র সুরক্ষার পাশাপাশি রক্তে প্রদাহ বহুগুণ কম থাকত।
ছবি: মঞ্জু আলম- স্বাভাবিক হাঁটাচলা ও কায়িক পরিশ্রম: তখনকার দিনে অফিসে, স্কুলে বা বাজারে হেঁটে যাতায়াত করা কিংবা সাইকেল চালানো ছিল খুব স্বাভাবিক বিষয়। ঘরের কাজগুলোও মানুষ নিজ হাতে করত। এই নিয়মিত স্বাভাবিক শারীরিক পরিশ্রম রক্তে ইনসুলিনের কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে চমৎকার ভূমিকা রাখত।
- গ্যাজেটহীন অবসর ও সামাজিক মেলবন্ধন: তখনকার দিনে স্ক্রিন স্ক্রলিং বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মতো ডিজিটাল ব্যস্ততা ছিল না। বিকেলের সময়টা কাটত বন্ধুদের সঙ্গে সামনাসামনি গল্প করে বা খোলা মাঠে খেলাধুলা করে। সামাজিকভাবে যুক্ত থাকার এই প্রবণতা মানসিক চাপ ও অ্যাংজাইটি বহুগুণ কমিয়ে দিত।
- নিয়মানুবর্তিতা ও সার্কাডিয়ান রিদম: সূর্যাস্তের পর আলো কমে এলে রাতের খাবার দ্রুত শেষ করা এবং রাত ৯টা-১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিল প্রায় সর্বজনীন। এতে শরীরে সঠিক সময়ে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ হতো, যা শরীরের প্রাকৃতিকভাবে কোষ মেরামতপ্রক্রিয়া ও গভীর ঘুম বজায় রাখত।
ছবি: মঞ্জু আলমবর্তমান সময়ে আমাদের করণীয়
এই একুশ শতকের জীবনে আশি বা নব্বইয়ের দশকের সব অভ্যাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে লাইফস্টাইলে কিছু ছোট পরিবর্তন আনা যেতেই পারে। সেসব পরিবর্তন আনলেও আমরা বর্তমান যুগে খানিকটা স্বাস্থ্য সুফল পেতে পারি।
- ৮০/২০ রুল ও ঘরোয়া যত্ন: প্রতিবেলা অন্তত ৮০ শতাংশ খাবার রাখুন ঘরের তৈরি। আর ছোটখাটো সমস্যায় ওষুধে অভ্যস্ত না হয়ে রান্নাঘরের প্রাকৃতিক উপাদানের সাহায্য নিন।
- দৈনন্দিন চলাফেরা বাড়ানো: সারা দিন দীর্ঘ সময় বসে কাজ না করে ফাঁকে হাঁটাচলা করার অভ্যাস করুন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা অল্প দূরত্বের রাস্তায় রিকশা ব্যবহারের বদলে হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- ডিজিটাল কার্ফু বা স্ক্রিন-ফ্রি সময়: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ও ল্যাপটপ দূরে রাখুন, যেন মস্তিষ্কে মেলাটোনিন ক্ষরণ সঠিকভাবে হতে পারে।
- সামাজিক যোগাযোগ বাড়ান: পরিবারের অন্যান্য সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ম করে সপ্তাহে কিংবা মাসে দেখা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে মানসিক চাপ কমে যাবে।
ছবিতে নস্টালজিক লুক দেওয়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় এই সাধারণ পরিবর্তনগুলো আনলে ফিল্টার ছাড়াই পাওয়া সম্ভব ন্যাচারাল গ্লো ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা।
লেখক: জিনিয়া কুলসুম, পুষ্টিবিদ