হোম > জীবনধারা > ফিচার

আজ পাথর সংগ্রহের দিনে জেনে নিন কিছু পাথুরে গল্প

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

সেপ্টেম্বর মাসের অন্যতম একটি দিন হলো কালেক্ট রক্স ডে বা পাথর সংগ্রহের দিন। ছবি: পেক্সেলস

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে শেষ কবে কোনো কিছু দেখে মনে মনে অনেক কিছু ভেবেছিলেন? কোনো গাছ কিংবা ফুল বা দেয়ালের লেখা? অনেকে মনে করতে পারবেন না। সেখানে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিরেট পাথরগুলোর দিকে আমরা কজনই-বা ফিরে তাকাই? কিন্তু কিছু মানুষের কাছে এই নিরেট পাথরই হয়ে ওঠে ইতিহাস, স্মৃতি কিংবা সৃষ্টিশীলতার এক অদ্ভুত ক্যানভাস। সেপ্টেম্বর মাসের অন্যতম একটি দিন হলো কালেক্ট রক্স ডে বা পাথর সংগ্রহের দিন। বিশ্বজুড়ে পাথর সংগ্রহ করার এই বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর শখ উদ্‌যাপন করতে দিনটি পালিত হয় ১৬ সেপ্টেম্বর।

পাথরের উৎস এবং ভূতত্ত্ব বা জিওলজির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। আগে মানুষ বিভিন্ন বিশ্বাস দিয়ে পাথরের উৎস ব্যাখ্যা করত। কিন্তু জেমস হাটনের মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণার পর ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ পায়। আজ মানুষ পৃথিবীর শিলা বা পাথর থেকে শুরু করে চাঁদের মতো মহাজাগতিক বস্তুর পাথর নিয়েও গবেষণা করছে। এই কৌতূহল ও পাথর সংগ্রহের শখ যে মানুষকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে, তার কিছু চমৎকার উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে।

পাথরের তৈরি স্কটল্যান্ডের মানচিত্র

সত্যিকারের রক স্টার হ্যারি ইয়ং পাথর দিয়ে তৈরি করেছিলেন স্কটল্যান্ডের মানচিত্র। ছবি: সংগৃহীত

ইস্ট রেনফ্রিউশায়ারের নিউটন মার্নসের বাসিন্দা ৮৫ বছর বয়সী হ্যারি ইয়ং। পেশাগত কাজে স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সময় এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের পাথর সংগ্রহ করা শুরু করেন। ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া এই সংগ্রহ অভিযান শেষ হয় ২০২০ সালে, প্রায় ৩০ বছর পর। সংগৃহীত শত শত পাথর নিখুঁতভাবে বসিয়ে তিনি তৈরি করে ফেলেন স্কটল্যান্ডের এক বিশাল মোজাইক মানচিত্র। এমনকি টেক্সচার বোঝাতে তিনি হাইল্যান্ডস অঞ্চলে পাথরের একাধিক স্তর ব্যবহার করেন। তাঁর ৮৫তম জন্মদিনে এই মানচিত্রের ছবি তাঁর নাতি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। ছবিটি মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। চার মিলিয়নের বেশি মানুষ তা দেখে। ইন্টারনেট তাঁকে অভিহিত করে ‘রক স্টার’ হিসেবে।

৮ বছরের বিলির স্মৃতির স্মারক

বিলির পরিবার এবং তার স্মারক। ছবি: সংগৃহীত

পাথর শুধু শিল্পের মাধ্যমই নয়, কখনো কখনো তা ধারণ করে ভালোবাসার আবেগ। লিনকনশায়ারের ৮ বছরের শিশু বিলি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে দ্রুত মারা যায়। সে অর্নিথিন ট্রান্সকার্বামাইলেস ডেফিশিয়েন্সি নামক একটি বিরল মেটাবলিক জটিলতায় ভুগছিল। জীবিত থাকতে বিলি ও তার ভাইবোনেরা ভ্রমণকালে পাথর সংগ্রহ করে তাতে রং করতে ভালোবাসত। বিলির মৃত্যুর পর তার স্মৃতির উদ্দেশে তার পরিবার বিলিস বোল্ডার্স নামে একটি গ্রুপ খোলে। মানুষ এখন বিভিন্ন রঙে পাথর এঁকে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়া থেকে শুরু করে জ্যামাইকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিলির সহপাঠীরাও একে একে পাথর সাজিয়ে বোল্ডার স্নেক তৈরি করেছে। প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক ভালোবাসায় বদলে দেওয়ার এক দারুণ প্রতীক এই পাথরগুলো।

লেখিকা অ্যান ব্রন্টের ভূতাত্ত্বিক জ্ঞান

লেখিকা অ্যান ব্রন্ট-এর পাথরের সংগ্রহ। ছবি: সংগৃহীত

১৯ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ লেখিকা অ্যান ব্রন্টকে মানুষ শুধু একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক হিসেবেই চিনত। কিন্তু গবেষণায় উঠে এসেছে, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ পাথর সংগ্রাহক ও ভূতত্ত্ব অনুরাগী। ১৮৪৯ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে তিনি এক বিশাল পাথরের সংগ্রহ গড়ে তোলেন। ইউনিভার্সিটি অব অ্যাবারডিনের গবেষকেরা রমন স্পেকট্রোস্কোপি বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখেন, অ্যান ব্রন্ট শুধু সুন্দর পাথর কুড়াননি, তিনি বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে কার্নেলিয়ান, অ্যাগেট, ফ্লোস্টোন এমনকি বিরল লাল অবসিডিয়ানের মতো মূল্যবান পাথর সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য টেন্যান্ট অব ওয়াইল্ডফেল হল’-এ তিনি রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভির বই ও ভূবিজ্ঞানের উল্লেখও করেছিলেন।

পাথর সংগ্রহ কেন করবেন

পাথর সংগ্রহ শুধু একটি শখ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিজ্ঞান, শিল্প এবং মানুষের অনুভূতি। একটি পাথর হতে পারে কোটি বছরের পুরোনো পৃথিবীর ইতিহাসের সাক্ষী, কোনো প্রিয়জনের অমলিন স্মৃতি কিংবা ৩০ বছর ধরে বুনে যাওয়া কোনো স্বপ্ন। তাই পরবর্তী সময়ে চলার পথে পায়ে ঠেকা কোনো পাথরের দিকে তাকালে মনে রাখবেন, চাইলে আপনিও তার মধ্যে খুঁজে নিতে পারেন এক নতুন গল্প।

সূত্র: বিবিসি