কথায় বলে, চোখ হলো মনের আয়না। কিন্তু চোখের পাতা? ফ্যাশন জগতে চোখের পাতা শুধুই নান্দনিক সাজ ও মেকআপের ক্যানভাস হতে পারে। কিন্তু সুইডিশ ফ্যাশন ব্র্যান্ড হোদাকোভার প্রতিষ্ঠাতা ও ডিজাইনার এলেন হোদাকোভা লারসনের মতে, এটি মানুষের আত্ম প্রতিফলন ও অনুভূতির এক অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। সম্প্রতি প্যারিস ফ্যাশন উইকে ব্র্যান্ডটির ২০২৭ সালের স্প্রিং সামার রানওয়ে শোতে মেকআপ প্রফেশনাল থমাস দ্য ক্লুভারের নিখুঁত ছোঁয়ায় মেকআপের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব পরাবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি।
এই শোতে মডেলদের বন্ধ চোখের পাতার ওপর দক্ষতায় আঁকা হয়েছে আরেক জোড়া কৃত্রিম চোখ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রিন্ট করা কৃত্রিম চোখের পাতা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, ফ্যাশন র্যাম্পে তৈরি হয় এক পরাবাস্তব ও দৃষ্টিভ্রমকারী চমৎকার দৃশ্যপট, যা রানওয়েতে উপস্থিত প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সচেতন দর্শককে যেমন এক পলকে চমকে দিয়েছে, তেমনই বাধ্য করেছে রূপকের আড়ালে লুকানো গভীর ভাবনায় ডুব দিতে।
র্যাম্প শো চলাকালে মডেলদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা ছিল তাঁরা যেন চোখের পাতা খানিকটা নিচু করে বা প্রায় বন্ধ করে হাঁটেন। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, মডেলরা চোখ পুরোপুরি বন্ধ করে ক্যাটওয়াক করছেন। অথচ তাঁদের বন্ধ চোখের পাতার ওপর আঁকা সেই নিষ্প্রাণ, শূন্য ও সমতল দ্বিতীয় জোড়া চোখ বিশ্বকে এক অপার্থিব চাহনিতে পর্যবেক্ষণ করছে। ব্যাকস্টেজ থেকে শুরু করে রানওয়ে, সবখানেই এই মেকআপ এক রোমাঞ্চকর, রহস্যময় ও কিছুটা ভৌতিক আবহের সৃষ্টি করে।
তবে রানওয়ের এই ছদ্মবেশী সৌন্দর্য শুধুই বাহ্যিক আকর্ষণ বা দর্শনার্থীদের ক্ষণিকের জন্য চমকে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই পরাবাস্তব মেকআপের পেছনে লুকানো ছিল পরিবেশ, সমাজ ও আধুনিক মানবসভ্যতার এক গভীর রূপক ও সময়োপযোগী বার্তা।
প্রকৃতি, গভীর সমুদ্র ও সামুদ্রিক জীবনকে কেন্দ্র করে হোদাকোভার এই নতুন কালেকশনটি সাজানো হয়। যেখানে সমুদ্রের তলদেশ ও তীর থেকে উদ্ধার করা পরিত্যক্ত শিল্পকারখানার মাছ ধরার জাল, পুরোনো জাহাজের দড়ি ও ক্যানভাস কাপড় পুনর্ব্যবহার বা আপসাইক্লিং করে আকর্ষণীয় সব আধুনিক পোশাক তৈরি করা হয়েছিল।
ডিজাইনার এলেন হোদাকোভা লারসন তাঁর এই অভিনব রূপচিন্তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, ‘এই মেকআপ লুকটি মূলত আত্মরক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি এবং গভীর অন্তর্দর্শনের ধারণাকে নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলে। তবে একই সঙ্গে এটি আমাদের আধুনিক মানুষের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বড় এক প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করায়।’
লারসনের মতে, শুধু চোখদুটো খোলা রাখলেই যে মানুষ সত্যি চারপাশের সবকিছু দেখতে বা উপলব্ধি করতে পারে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। আমাদের সুন্দর এই পৃথিবী যখন প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশগত চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তখন আমরাও কি চরম উদাসীনতায় সচেতনভাবে চোখ বন্ধ করে রাখছি না? বন্ধ পাতার ওপর কৃত্রিম চোখের এই অনন্য ক্যানভাস যেন মানুষের সেই উদাসীনতা ও চোখের সামনে ঘটতে থাকা পরিবেশ ধ্বংসকে না দেখার স্বভাবজাত প্রবণতাকে সরাসরি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
বর্তমান যুগে ফ্যাশন এখন আর শুধু সুন্দর জামাকাপড় পরিধান বা গ্ল্যামারাস সাজগোজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক সংকট তুলে ধরার ও শক্তিশালী বার্তা প্রকাশের অন্যতম জোরালো মাধ্যম। হোদাকোভার এই অপার্থিব মেকআপ লুক বিউটি ইন্ডাস্ট্রি ও মেকআপ শিল্পকে এক নতুন দার্শনিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বন্ধ চোখের পাতায় দ্বিতীয় জোড়া কৃত্রিম চোখের এমন অপার্থিব চাহনি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা আসলেই কতটা পরিবেশ প্রীতি ও নৈতিকতায় সচেতন, আর কতটা চোখ বুজে অন্ধ সেজে থাকি।
সূত্র: ভোগ