গত বছরের নভেম্বরে প্রথম কন্যাসন্তানের মা হন ক্যাটরিনা কাইফ। সন্তান জন্মের পর নতুন অতিথিকে নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওজন বেড়েছে। চিবুকে, কোমরে সেই তীক্ষ্ণভাব নেই। নতুন মায়েদের ঠিক যেমন লাগে, ক্যাটরিনাও এর ব্যতিক্রম নন এখন। সম্প্রতি একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার পর থেকে শুরু হয়েছে আলোচনা। স্বামী ভিকি কৌশলের সঙ্গে পরিচালক কুকু কোহলির শেষকৃত্যে হাজির হয়েছিলেন অভিনেত্রী। সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা বেশ কিছু ভিডিও এবং ছবি সামনে আসার পর থেকেই নেটিজেনদের একাংশ নানারকম মন্তব্য করতে শুরু করেন। ‘ক্যাটরিনার এ কী হলো?’, ‘বুড়িয়ে গেছেন অভিনেত্রী?’ এমনভাবে অনেকেই কটাক্ষ করেছেন তাঁকে। অন্য পক্ষ আবার নায়িকার পক্ষেই কথা বলেছেন।
একটি নতুন প্রাণের জন্ম দেওয়া একজন নারীর জীবনের অন্যতম সুন্দর এবং বিচিত্র অভিজ্ঞতা। তবে এই মাতৃত্বের আনন্দ উদ্যাপনের মাঝেই অনেক নতুন মাকে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যার নাম ‘বডি শেমিং’।
চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘সন্তান জন্মদানের পর নারীর শরীরে স্ট্রেচ মার্ক পড়া, ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, পেট ঝুলে যাওয়া বা স্তনের গঠনে পরিবর্তন আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আশপাশের মানুষ প্রায়ই এই ত্যাগের সৌন্দর্যকে ভুলে গিয়ে অবাস্তব শারীরিক সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে নতুন মায়েদের বিচার করতে শুরু করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিকটাত্মীয়, বন্ধুবান্ধব বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিচিত মানুষদের ‘এত মোটা হয়ে গেছ কেন?’, ‘পেটটা তো এখনো কমেনি’, কিংবা ‘আগের মতো গ্ল্যামার নেই’—এমন সব মন্তব্য একজন নতুন মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করার সময় এই ধরনের মন্তব্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।’
মাতৃত্বের পর যদি আপনিও এমন বডি শেমিং বা শরীর নিয়ে কটূক্তির শিকার হন, তবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখতে কয়েকটি বিষয় অনুশীলন করতে পারেন।
আশপাশের মানুষের কথা শুনে নিজের শরীরকে অপছন্দ করতে শুরু করবেন না। সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘আগে নিজেকে নিজের গ্রহণ করতে শিখতে হবে। এই শরীরটিই ৯ মাস ধরে একটি নতুন প্রাণকে আগলে রেখেছে এবং তাকে পৃথিবীতে এনেছে। ফলে পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক–এটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে।’ বুকের দুধ পান করানোর দিনগুলোয় হুটহাট ক্রাশ ডায়েট মেনে ওজন ঝরানোর চিন্তা করাও স্বাভাবিক নয় সেটাও বুঝে চলতে হবে বলে জানান তিনি। ব্যায়াম করা যেতেই পারে, তবে শরীরের ভাষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।
কেউ আপনার ওজন বা শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করলে বিনম্র কিন্তু দৃঢ়ভাবে আপনার আপত্তি জানান। আপনি সরাসরি বলতে পারেন, ‘একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর আমার শরীর এখন সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে ওজন বা চেহারা নিয়ে আলোচনা না করলেই আমি খুশি হব।’ আপনার স্পষ্ট অবস্থান অন্যকে পরবর্তী সময়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘স্লিম’ বা সন্তান জন্মের পর পরই অনেকটা ওজন ঝরিয়ে ফেলা তারকাদের ছবি দেখে নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করুন। আপনার শরীরকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে সময় দিন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, পুষ্টিকর খাবার খান ও ব্যায়ামের জন্য পুরোপুরি তৈরি হতে সময় দিন।
এমন মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান, যাঁরা আপনাকে বোঝেন, মানসিক সমর্থন দেন এবং ইতিবাচক শক্তি জোগান। আপনার সঙ্গী, পরিবারের নির্ভরযোগ্য সদস্য বা বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে নিজের অনুভূতি শেয়ার করুন। প্রয়োজনে সমমনা নতুন মায়েদের কোনো গ্রুপ বা কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, যেখানে একে অপরের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া যায়।
সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘একটি শরীর ৯ মাস ধরে পরিবর্তিত হয়েছে, তাই এটি আগের অবস্থায় ফিরতে পর্যাপ্ত সময় নেবে। তাড়াহুড়ো করে ক্র্যাশ ডায়েট বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করতে যাবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করুন এবং হালকা হাঁটাচলা করুন। ওজন কমানোর উদ্দেশ্য যেন হয় সুস্থতা, অন্যকে খুশি করা নয়।’
যদি চারপাশের মানুষের মন্তব্য আপনার দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সৃষ্টি করে, তবে দ্বিধা না করে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। তিনি আপনাকে সুন্দরভাবে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের পথ বলে দেবে।
মাতৃত্বের এই জার্নিতে শরীর পরিবর্তন হবেই, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া অবাস্তব সৌন্দর্যের ধারণার চেয়ে আপনার সুস্থতা এবং আপনার সন্তানের হাসিমুখ অনেক বেশি মূল্যবান। নিজেকে মনে করিয়ে দিন, আপনি একজন মা এবং আপনি অসাধারণ!
সূত্র: এক্সপেক্টফুল ও অন্যান্য