স্কুলের ক্লাসরুমে পুরো ব্ল্যাকবোর্ড জটিল সমীকরণ। বোর্ডে লেখা সেই শান্ত সংখ্যাগুলো তখন অনেকের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে। সেগুলো দেখে কপালে ঘাম জমে যাওয়া কিংবা পরীক্ষার খাতায় এক্সের মান খুঁজতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন অনেকে। অঙ্ক বা গণিত বলতেই অনেকের কাছে ভয়ের এক নাম। তবে মজার বিষয় হলো, যে অঙ্ককে এড়িয়ে চলতে আমরা এত কসরত করি, সেই অঙ্কের শক্তির ওপর নির্ভর করেই কিন্তু গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতার প্রযুক্তিগত রাজত্ব। কেউ গণিতকে বলে বিমূর্ত বা জটিল হিসাবের বিজ্ঞান, আবার কারও কাছে এটি স্রেফ সংখ্যা আর সূত্রের গোলকধাঁধা। তবে এই গোলকধাঁধাকে জয় করা শীর্ষ বিজ্ঞানী ও তরুণ শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক দৌড় কিন্তু থেমে নেই। বিশ্বজুড়ে গণিত শিক্ষার ভিন্ন চিত্র, কোনো দেশে গবেষণার বিশ্বজয়ী জোয়ার আর কোথায় মাধ্যমিকের তরি ডুবছে—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিক্ষা সূচক ও প্রতিযোগিতার তথ্যাদি গণিত চর্চার এক চোখধাঁধানো রূপ সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্বজুড়ে গণিত শিক্ষার অবস্থা এবং বিভিন্ন দেশের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখ পড়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শীর্ষ বিজ্ঞানী ও গবেষণার ক্ষেত্রে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর প্রাধান্য দেখা গেলেও ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের গণিত দক্ষতার আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে আবার ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষস্থানীয় গণিত বিজ্ঞানীদের আবাসস্থল হলেও তরুণ শিক্ষার্থীদের গণিত পারফরম্যান্সে দেশটি এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে। গত সেপ্টেম্বরে ওইসিডি প্রকাশিত পিএসএ ২০২৫ রিপোর্ট অনুযায়ী, গণিতে এশীয় শিক্ষার্থীরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চ ডট কম ২০২২ সালে বিশ্বে ৩ হাজার ৭০৭ জনের বেশি গণিত বিজ্ঞানীর ডি-ইনডেক্স মূল্যায়ন করে একটি র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে। বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার বিজ্ঞানীর মধ্যে ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত। দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাজ্য (৬৩ জন) এবং তৃতীয় স্থানে জার্মানি (৬০ জন)। এরপর রয়েছে ফ্রান্স (৫৩), চীন (৪৭), কানাডা (৩৮) এবং ইতালি (৩১)। কলেজিয়েট পর্যায়ে শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানের ৯টিই যুক্তরাষ্ট্রের। যেমন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। একমাত্র অ-মার্কিন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ দশম স্থানে রয়েছে, যেখানে ১২ জন শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদ রয়েছেন।
ওইসিডির পিএসএ ২০২৫ রিপোর্টে ৯১টি দেশের ১৫ বছর বয়সী ৭ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থীর গাণিতিক দক্ষতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। শীর্ষ ৭টি স্থানেই রয়েছে এশীয় দেশ ও অঞ্চল। ৪টি জুরিসডিকশন (বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু, চচিয়াং) নিয়ে গড়ে ৬১২ স্কোর পেয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে চীন। এটি ওইসিডি গড়ের চেয়ে ১৫০ পয়েন্ট বেশি। অন্য এশীয় দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর (৫৬৩) দ্বিতীয়, ম্যাকাও (৫৪৯) তৃতীয়, তাইওয়ান (৫৪৬) চতুর্থ, জাপান (৫২৫) পঞ্চম, সাউথ কোরিয়া ও হংকং (৫২২) যৌথভাবে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।
ইউরোপে এস্তোনিয়া (৫০৮), সুইজারল্যান্ড (৪৯৯) ও যুক্তরাজ্য (৪৮৮) শীর্ষে রয়েছে। আমেরিকায় কানাডা (৪৮৫) ভালো অবস্থান দেখালেও যুক্তরাষ্ট্র (৪৬৩) শুধু ওইসিডি গড়ের সমান অর্জন করেছে। ইউরোপের বড় অর্থনৈতিক শক্তি ফ্রান্স (৪৫৮), স্পেন (৪৫৭) এবং সমৃদ্ধ দেশ নরওয়ে (৪৫২) ও আইসল্যান্ড (৪৫০) ওইসিডি গড়ের নিচে অবস্থান করছে। সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনামের শিক্ষার্থীরা (৪৪৩)।
ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট এবং পিএসএ রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে বিগত এক দশকে ওইসিডি দেশগুলোতে গণিতের গড় স্কোর ২২ পয়েন্ট কমেছে। এটি প্রায় এক বছরের শিক্ষার সমতুল্য ক্ষতি। এর প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা অবসর বিনোদনে ডিজিটাল টুলের অতিরিক্ত ও নিবিড় ব্যবহারকে দায়ী করা হয়েছে। তবে রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রযুক্তির একেবারে ব্যবহারে অনীহা বা অতিরিক্ত ব্যবহারের চেয়ে পরিমিত ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীরা গণিতে তুলনামূলক ভালো ফল অর্জন করেছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি ডাইজেস্ট, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ