সহপাঠী বা প্রিয় বন্ধুটির জন্মদিন মানেই অনেক অনেক আনন্দ। পরিকল্পনা চলছে জন্মদিনে কী দেওয়া যায় তা নিয়ে। কীভাবে উইশ কার্ড বানানো যায়, চকলেট বা গিফট কোনটা ভালো হয়। কত কত পরিকল্পনা। এসব পরিকল্পনার মাঝে যদি দেখা যায় সহপাঠী জন্মদিনের আয়োজনে দাওয়াতই দেয়নি, এর থেকে কষ্টের আর কি হতে পারে! আপনার স্কুলপড়ুয়া সন্তানটির এই মন ভাঙা সময়টিতে কীভাবে তার সঙ্গে থাকবেন সেটিই ভাবনার বিষয়!
এই অবস্থায় করণীয় জানালেন শিক্ষা ও শিশুমনোবিজ্ঞানী ডা. সাশা হল। সিবিবিসির ‘প্যারেন্টিং ডাউনলোড’ অনুষ্ঠানে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তিনি।
সাশা হলের তিন বছর বয়সী একটি ছেলে ও পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমেই বুঝতে হবে, এ ধরনের পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সন্তান লালন-পালনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আমাদের সবার সন্তানকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।’
ডা. হলের মতে, এমন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে ইচ্ছা হতে পারে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে তা শিশুর জন্য সহায়ক নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা সন্তানের সামনে আসা সব বাধা দূর করে দিতে পারি না। তবে সেগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া যায় সেটি শেখাতে পারি।’
হল আরও বলেন, ‘বিষয়টি হলো তাদের মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলা। ফলাফল বদলে দেওয়ার চেষ্টা না করে আমরা তাদের কী কী দক্ষতা শেখাতে পারি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
কৌতুকশিল্পী, লেখক ও দুই সন্তানের মা ক্যারিয়াড লয়েড মনে করেন, কোনো শিশুর জন্য এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া খুবই কষ্টকর। তাঁর ভাষায়, ‘শিশুরা যখন ছোট থাকে, তখন বিষয়টি প্রথম প্রেমের মতো মনে হয়। সবকিছুই অনেক বেশি তীব্র অনুভূত হয়, বিশেষ করে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের ব্যাপারটি। কোনো না কোনো শিশুর অনুষ্ঠানে সবাই কখনো না কখনো দাওয়াত পায় না।’
ডা. হলের পরামর্শ, জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যেতে না পারার বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ না করে অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারেন অভিভাবকেরা। সে জন্য বিকল্প কোনো আয়োজনের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ওই শিশু তোমাকে দাওয়াত করেনি। তাহলে চলো, এমন কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা যাক, যার সঙ্গে অন্য কিছু করা যায়।’
লেখক লয়েড মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শিশুদের বোঝানো সহজ হয় যে, সব ক্ষেত্রে সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না। তিনি বলেন, ‘তারা অনেক অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাবে, আবার অনেক অনুষ্ঠানে পাবে না। একসময় তারা আর হিসাব রাখবে না।’
লয়েড আরও বলেন, ‘একদিন তারা বাড়ি ফিরে বলবে, অমুক মন খারাপ করেছে, কারণ তাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। তখন আপনি বলতে পারবেন, মনে আছে, একবার তোমাকেও তো ওই শিশুর জন্মদিনে ডাকা হয়নি? এভাবে কখনো একজন, কখনো আরেকজনের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটতে থাকে। ফলে বিষয়টি আর অতটা বড় মনে হয় না।’
আপনার সন্তানকে জন্মদিনে দাওয়াত না করাতে তার কোনো ভুল নেই এটা বুঝাতে হবে তাকে। ডা. হল বলেন, ‘এখানে অনেক বিষয় কাজ করে। বিশেষ করে পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তারা এখনো নিজেদের সম্পর্কে এমন কোনো ধারণা তৈরি করে না যে তারা দুষ্টু বা খারাপ। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে আপনার সন্তানের কোনো সম্পর্ক থাকে না।’
এ দিকে লয়েড মনে করেন, দাওয়াত না পাওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণগুলো সন্তানকে বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘সন্তানের জন্মদিনে সব বাবা-মায়ের পক্ষে ১০-২০টি শিশুকে দাওয়াত দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না। তাই আপনার শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে, যে তারা যে কয়জনকে দাওয়াত দিয়েছে, নিশ্চয়ই কোনো কারণে তাদের তালিকায় তার নাম আসেনি।’
কোনো শিশু দাওয়াত না পাওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তবে তাঁর মতে, ‘এর সঙ্গে অভিভাবকের নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক থাকতে পারে। ওই বয়সে তাঁর নিজের যদি মাত্র দু-একজন বন্ধু থেকে থাকে, তাহলে ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান করতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। আবার নিজের সন্তানকে লাজুক স্বভাব থেকে বের করে আনতে কেউ বড় আয়োজনও করতে পারেন।’
ডা. হল আরও বলেন, শিশুদের বয়স কিছুটা বাড়ার পর বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও গভীর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই এখন যে ঘটনাটি তাদের কাছে খুব বড় মনে হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সেটির গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই বছর বয়সে শিশুরা অন্যদের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। তবে তখনো তারা মূলত পাশাপাশি খেলাধুলা করে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে তারা সামাজিকভাবে অন্যদের সঙ্গে মিশতে এবং পছন্দের সঙ্গী বেছে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা হয়তো বলবে, আজ অমুকের সঙ্গে খেলেছি। কিন্তু পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সের দিকে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হয় এবং শিশুর কাছে তা সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
এ কারণে শিশুদের বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন ডা. হল। তিনি বলেন, ‘তাই কোনো শিশুকে নিয়ে একবার খেলাধুলার জায়গায় গেলেন, সেখানে সে আরেকটি শিশুকে দুবার দেখল, এতেই ধরে নেওয়া যায় না যে তারা বন্ধু হয়ে গেছে।’
প্রাপ্তবয়স্করা কীভাবে পরিচিত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন, তা নিয়ে করা একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিচিত থেকে বন্ধু হতে ৪০ থেকে ৬০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। আর পরিচিত থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে সময় লাগে প্রায় ২০০ ঘণ্টা।