সঙ্গীর প্রাক্তনকে নিয়ে মনের ভেতর হীনম্মন্যতা, অনর্থক ভয় আর তীব্র আচ্ছন্নতা। এই বিষয়গুলো আধুনিক রোমান্টিক সম্পর্কের এক নীরব কিন্তু ধ্বংসাত্মক ব্যাধি। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গীর অতীত জীবন সম্পর্কে অতি কৌতূহল যখন মানসিক যন্ত্রণায় রূপ নেয়, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় রেট্রোঅ্যাক্টিভ জেলাসি বা রেবেকা’স সিনড্রোম। সম্প্রতি টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রাক্তনের কাজকর্ম সহজে খুঁজে পাওয়ার কারণে এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট। বর্তমান সম্পর্কের সবটুকু সুন্দর থাকা সত্ত্বেও কেন অতীতের ছায়া মানুষকে এমন তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দেয়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই লেখা।
এই সিনড্রোমের নামটি এসেছে কালজয়ী ব্রিটিশ লেখিকা ডাফনে দ্যু মারিয়ের কাছ থেকে। না, এর নামকরণ তিনি করেননি। এটি নেওয়া হয়েছে তাঁর লেখা উপন্যাস থেকে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘রেবেকা’তে এই সিনড্রোমের কথা উল্লেখ করেন তিনি। উপন্যাসে দেখা যায়, একজন তরুণী তাঁর নতুন স্বামী ম্যাক্সিম ডি উইন্টারের প্রয়াত প্রথম স্ত্রী রেবেকার স্মৃতি, আকর্ষণ ও রূপ নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সেই নিরাপত্তাহীনতা থেকে তিনি নিজেকে সব সময় রেবেকার তুলনায় খাটো মনে করেন। বর্তমানেও সঙ্গীর প্রাক্তন বা অতীত নিয়ে এই ধরনের তীব্র ঈর্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক আচ্ছন্নতাই রেবেকা সিনড্রোম নামে পরিচিত।
রেবেকা’স সিনড্রোম বা রেট্রোঅ্যাক্টিভ জেলাসিতে ভোগা ব্যক্তিরা মূলত সঙ্গীর প্রাক্তনের চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকেন। থেরাপিস্টদের মতে, এই প্রবণতা কিন্তু বর্তমান সম্পর্কের কোনো ঘাটতি বা বিশ্বাসের অভাব থেকে তৈরি হয় না। বরং এর পেছনে কাজ করে রোগীর নিজের শৈশবের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত বা অ্যাটাচমেন্ট প্রবলেম। শৈশবে পরিবারে অবহেলা বা পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় অনেকের মধ্যে থেকে যায়। এই অনুভূতি নিয়ে বড় হওয়া মানুষগুলো রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ানোর পর পুরোনো মানসিক ক্ষতগুলো তাঁদের সামনে উঠে আসতে থাকে। সেই ক্ষতগুলো রূপ বদলে সঙ্গীর অতীতের প্রতি তীব্র হিংসা ও উদ্বেগে পরিণত হয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ১৯০৯ সালের বিখ্যাত কেস স্টাডি ‘দ্য র্যাটম্যান’-এর মতোই এখানে মানুষ অতীতে ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে বর্তমানে অনর্থক দুশ্চিন্তা করে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একধরনের অবসেসিভ নিউরোসিস। এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাভাবনা বা ছবি বারবার মস্তিষ্কে আঘাত করে। ভুক্তভোগীরা ভাবেন যে সঙ্গীর অতীতের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে বুঝি দুশ্চিন্তা কমবে। কিন্তু বাস্তবে উত্তর পাওয়ার পর কৌতূহল ও প্রশ্ন জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে এবং ব্যক্তি এক বিশাল মানসিক ফাঁদ বা র্যাবিট হোল-এ হারিয়ে যান।
সোশ্যাল মিডিয়া এবং আধুনিক প্রযুক্তির কারণে রেবেকা’স সিনড্রোমের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এখন খুব সহজে সঙ্গীর প্রাক্তনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল, পুরোনো ছবি বা তথ্য খুঁজে বের করা সম্ভব; যা মানসিক আচ্ছন্নতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গীর মোবাইল ফোন দেখা বা বারবার প্রাক্তনের বিষয়ে জানতে চাওয়ার মতো বিষয়গুলো সম্পর্কের বিশ্বাস নষ্ট করে। এমনকি দীর্ঘ মেয়াদে সুন্দর একটি সম্পর্ককেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। সঙ্গীর অতীত বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানকে উপভোগ করা পুরোপুরি নিজের হাতে। অতীত নিয়ে দুশ্চিন্তা করে সুন্দর একটি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
সঙ্গীর প্রাক্তন বা অতীত নিয়ে প্রশ্ন করা এবং তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া বা মোবাইল ফোন চেক করার মতো নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।
সমস্যাটি সঙ্গীর অতীতের নয়, বরং নিজের পুরোনো ভয় ও নিরাপত্তার অভাব থেকে আসছে, এই সত্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পরিস্থিতিকে কিছুটা দূর থেকে নিরপেক্ষভাবে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যাতে ধারণাপ্রসূত আবেগ দিয়ে মন চালিত না হয়।
এটি যেহেতু একটি অবসেসিভ মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, তাই প্রয়োজনে সাইকোথেরাপিস্টের সাহায্য নিয়ে শৈশবের মানসিক ক্ষতগুলো নিরাময়ের চেষ্টা করা উচিত।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট