আমরা অনেকে পুরোনো জিনিস সহজে ফেলে দিতে পারি না। অনেকের কাছে ছোটবেলার পুরোনো জামা পরম আদরে আলমারিতে তুলে রাখা থাকে। একটা সময় এই ধরনের জিনিসে ভরে যায় আলমারি, ওয়ার্ডরোব কিংবা ঘরের একটা কোনা। এই জিনিসগুলো স্মৃতি ধরে রাখে কিন্তু প্রয়োজনীয় নয়। তখন আমরাই আবার জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাঁটাই বা ‘ডিক্লাটারিং’ করার জন্য কত রকমের ট্রিকস বা ট্রেন্ড অনুসরণ করি।
কেউ ৪০ দিনে ৪০ ব্যাগ আবর্জনা ফেলার চ্যালেঞ্জ নেন, আবার কেউ ম্যারি কনডোর সেই বিখ্যাত ‘স্পার্ক জয়’ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। স্পার্ক জয় পদ্ধতি অনুযায়ী যেখানে যা কিছু আনন্দ দেয় না, তা ফেলে দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ঘরে যদি ছোট বাচ্চারা থাকে, তবে কোনটি আপনার কাছে আনন্দদায়ক আর কোনটি শিশুর কাছে, তা মেলানো কঠিন। গৃহস্থালির এই জঞ্জাল সামলাতে সামলাতে যখন ক্লান্ত, ঠিক তখনই একটি ভিন্নধর্মী জীবনদর্শনের খোঁজ পাওয়া যায়—‘সুইডিশ ডেথ ক্লিনিং’।
কথাটি শুনতে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে এর পেছনের দর্শনটি বাস্তবতা। মার্গারেটা ম্যাগনাসনের লেখা ‘দ্য জেন্টল আর্ট অব সুইডিশ ডেথ ক্লিনিং’ বইয়ে এই পদ্ধতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এর মূলভাব হলো—নিজের মৃত্যুর পর পরিবার যেন আমাদের রেখে যাওয়া অসংখ্য জিনিসপত্র নিয়ে বিবাদ, মানসিক চাপ বা ভোগান্তিতে না পড়ে, সে জন্য জীবিত থাকতেই নিজের ব্যবহার্য এবং পার্থিব জিনিসপত্র গুছিয়ে ও ছাঁটাই করে ফেলা। বয়সের শেষ কোঠায় না গিয়েও তিন সন্তান ও সংসার সামলানো যেকোনো ব্যস্ত মানুষের জীবনে এই ভিন্নধর্মী পদ্ধতি অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পারে।
এই দর্শন জীবনযাত্রায় প্রয়োগ খুব বেশি কঠিন নয়। একটু বুদ্ধি আর সামান্য পরিকল্পনায় ঘরের চিত্র বদলে ফেলা যায়।
কাপড়চোপড় ছাঁটাই: ঘরের প্রত্যেক সদস্যের আলমারির পোশাকগুলোকে দুই ভাগ করে ফেলুন। একটি থাকবে ব্যবহারের জন্য, অন্যটি ফেলে দেওয়া বা দান করার জন্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফেলে দেওয়া পোশাক রেখে দেওয়া পোশাকের চেয়ে বেশি হয়। এতে করে জামাকাপড় ধোয়া এবং ধোয়ার পর তা গোছানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তিকর কাজ এক বিকেলে অর্ধেক হয়ে যায়।
শিশুদের খেলনা ও ঘরের পরিবেশ: শিশুদের জন্য ছোট ছোট কাপড় কিংবা পাটের তোড়া বা ফোল্ডিং ব্যাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। নিয়মটি খুব সাধারণ। তারা শুধু প্রিয় খেলনাগুলোই সেই ব্যাগে রাখবে, আর বাকি সব ছাঁটাই করে দান করা হবে। এতে শিশুরা অতিরিক্ত পছন্দের ভিড়ে বিভ্রান্ত হয় না এবং তাদের একঘেয়েমিও দূর হয়। দিনের শেষে ঘর পরিষ্কার করার কাজটি কোনো ঝগড়া ছাড়া মাত্র ১০ মিনিটের একটি মজার খেলায় রূপ নেয়।
‘ডেথ কিট’ বা জরুরি নথি প্রস্তুত: জীবনের চূড়ান্ত পরিণতির কথা চিন্তা করে সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বন্ধকি কাগজপত্র, প্রয়োজনীয় ডিজিটাল পাসওয়ার্ড এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত নির্দেশাবলি একসঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ফাইলে গুছিয়ে রাখা। একে বলা যায় ডেথ কিট। ফলে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা বিপদে পরিবারের সদস্যরা অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচে এবং মানসিকভাবে অনেকটাই চাপমুক্ত থাকা যায়।
ব্যক্তিগত ‘সিক্রেট বক্স’: মানুষের এমন কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি, চিঠি বা স্মারক থাকে, যা শুধু তার নিজের কাছেই মূল্যবান, কিন্তু মৃত্যুর পর অন্যদের কাছে তা অর্থহীন বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এমন জিনিসপত্রের জন্য একটি আলাদা বক্স তৈরি করে তাতে স্পষ্ট করে লিখে রাখা যেতে পারে, ‘আমার মৃত্যুর পর এটি না খুলে সরাসরি ফেলে দেবে।’
সুইডিশ ডেথ ক্লিনিংয়ের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো, এটি সাধারণ ও সহজ জীবন যাপন করতে শেখায়। সুখী হওয়ার জন্য বহুমুখী ও দামি জিনিসে ঘর ভরিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল ছেঁটে ফেললে ঘরে যেমন নিশ্বাস নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হয়, তেমনি প্রতিনিয়ত ঘর পরিষ্কার করার ঝক্কি থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। ঘর যখন জঞ্জালমুক্ত ও গোছানো থাকে, তখন পরিবারের মানসিক পরিবেশও অনেক শান্ত হয়ে ওঠে। অহেতুক জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার পেছনে সময় নষ্ট না করে সেই সময়টা প্রিয়জনদের সঙ্গে সুন্দরভাবে কাটানোই তো জীবনের আসল আনন্দ। সুইডিশ ডেথ ক্লিনিং শুধু ঘর পরিষ্কারের কোনো কৌশল নয়, বরং পরিবারকে মানসিকভাবে মুক্ত এবং প্রফুল্ল রাখার এক জাদুকরি দর্শন।