হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

ব্রণ খোঁটার অভ্যাস বিপদের কারণ

ডা. মো. আরমান হোসেন রনি 

কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে ব্রণ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কিন্তু মুখে ব্রণ হওয়া সাধারণ একটি সমস্যা। অনেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্রণ খোঁটেন, চাপ দিয়ে পুঁজ বের করার চেষ্টা করেন বা নখ দিয়ে ব্রণ ফাটিয়ে ফেলেন। আপনি কি জানেন, মুখের নির্দিষ্ট কিছু জায়গার ব্রণ খোঁটা বা সংক্রমিত ফোড়া অবহেলা করা কখনো কখনো গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। বিরল হলেও এমন একটি ভয়ংকর জটিলতার নাম ক্যাভারনাস সাইনাস থ্রম্বোসিস।

ক্যাভারনাস সাইনাস থ্রম্বোসিস কী

আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর ভেনাস সাইনাস নামে কিছু বিশেষ শিরার মতো রক্তনালি রয়েছে। এর মধ্যে চোখের পেছনের দিকে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্যাভারনাস সাইনাস। মুখ, নাক ও চোখের আশপাশের কিছু শিরার সঙ্গে এই অংশের সংযোগ রয়েছে। মুখের কোনো সংক্রমণ ছড়িয়ে গিয়ে যদি ক্যাভারনাস সাইনাসে পৌঁছায়, তাহলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় ক্যাভারনাস সাইনাস থ্রম্বোসিস।

এটি একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত গুরুতর রোগ, যা দ্রুত চিকিৎসা না হলে চোখ ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

মুখের যে জায়গার ব্রণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

নাক ও মুখের ওপরের অংশ, বিশেষ করে নাকের দুই পাশ থেকে ওপরের ঠোঁট পর্যন্ত অনেক সময় বিপজ্জনক হয়। এই অংশের সংক্রমণ বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হয়। কারণ, এখানকার কিছু শিরার মাধ্যমে সংক্রমণ গভীর অংশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নাকের ওপরের ব্রণ, নাকের পাশে ফোড়া, ওপরের ঠোঁটের আশপাশের সংক্রমিত ব্রণ, চোখের কাছাকাছি ফোড়া বা পুঁজযুক্ত ব্রণ জোরে চাপ দেওয়া, নখ দিয়ে খোঁটা বা অপরিষ্কার হাতে ফাটানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, সব ব্রণ খুঁটলে ক্যাভারনাস সাইনাস থ্রম্বোসিস হবে—এমন নয়। এটি অত্যন্ত বিরল একটি জটিলতা। কিন্তু সংক্রমণ হলে এবং তা ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি গুরুতর হতে পারে।

যেভাবে ব্রণ থেকে বিপদ হতে পারে

ব্রণ খোঁটার সময় নখ বা হাতের জীবাণু ক্ষতস্থানে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে যদি সেখানে আগে থেকেই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থাকে, তাহলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। সংক্রমণ ধীরে ধীরে ত্বক ও আশপাশের টিস্যু থেকে শিরার মাধ্যমে গভীর অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া রক্তনালির দেয়ালে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ক্যাভারনাস সাইনাসে আক্রান্ত হলে চোখ ও স্নায়ুর কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

ক্যাভারনাস সাইনাস থ্রম্বোসিস একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা। ফলে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—

তীব্র মাথাব্যথা: হঠাৎ বা ক্রমেই বাড়তে থাকা তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে।

চোখ ফুলে যাওয়া: একটি বা উভয় চোখের চারপাশ ফুলে যেতে পারে।

চোখ লাল হয়ে যাওয়া: চোখ ও চোখের পাতায় লাল ভাব দেখা দিতে পারে।

চোখে তীব্র ব্যথা: চোখ নড়ানোর সময় ব্যথা হতে পারে।

ডাবল দেখা: চোখের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু আক্রান্ত হলে দুটি জিনিস দেখা বা চোখ নড়াতে সমস্যা হতে পারে।

চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়া: দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া বা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

জ্বর: সংক্রমণের কারণে জ্বর ও শরীর খারাপ লাগতে পারে।

চোখ সামনে বেরিয়ে আসার মতো দেখা: চোখের চারপাশে চাপ ও ফোলা বাড়লে চোখ কিছুটা সামনে বেরিয়ে আসতে পারে।

কখন হাসপাতালে দ্রুত যাবেন

মুখ বা নাকের আশপাশে সংক্রমিত ব্রণ বা ফোড়া হওয়ার সঙ্গে যদি—

  • জ্বর হয়;
  • চোখ ফুলে যায়;
  • চোখ লাল হয়;
  • চোখে ব্যথা হয়;
  • চোখ নড়াতে সমস্যা হয়;
  • ডাবল দেখা শুরু হয়;
  • দৃষ্টি ঝাপসা বা কমে যায়;
  • তীব্র মাথাব্যথা হয়;
  • তাহলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

রোগটি কীভাবে নির্ণয় করা হয়

চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করতে পারেন; যেমন—

  • রক্ত পরীক্ষা।
  • সিটি স্ক্যান।
  • এমআরআই।
  • বিশেষ ধরনের রক্তনালির ইমেজিং।
  • চোখের নড়াচড়া, দৃষ্টিশক্তি এবং স্নায়ুর কার্যক্রম পরীক্ষা।

চিকিৎসা কী

ক্যাভারনাস সাইনাস থ্রম্বোসিস সন্দেহ হলে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে—

  • শিরাপথে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া।
  • সংক্রমণের উৎস শনাক্ত ও চিকিৎসা।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বিশেষ চিকিৎসা।
  • চোখ, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের অবস্থা পর্যবেক্ষণ।
  • রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।

কীভাবে প্রতিরোধ করবেন

প্রতিরোধের জন্য কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলুন—

  • ব্রণ খুঁটবেন না।
  • হাত পরিষ্কার রাখুন।
  • অপরিষ্কার হাতে বারবার মুখ স্পর্শ করবেন না।
  • সংক্রমিত ফোড়া অবহেলা করবেন না।
  • চোখের আশপাশের সংক্রমণকে গুরুত্ব দিন।
  • ব্রণের জন্য নিরাপদ চিকিৎসা নিন।
  • প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

লেখক: কনসালট্যান্ট (চক্ষু)

দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবহানবাগ, ঢাকা