নিজের কঠোর পরিশ্রম এবং মেধা দিয়ে সাফল্য অর্জনের পরও কি মনে হয়, ‘আমি হয়তো এর যোগ্য নই, ভাগ্যক্রমে হয়ে গেছে!’ কিংবা সব সময় কি এই ভয়ে থাকেন যে একদিন সবাই ধরে ফেলবে, আপনি আসলে ততটা দক্ষ নন, যতটা তাঁরা ভাবছেন! চমৎকার সব সাফল্য নিজের ঝুরিতে থাকার পরেও নিজেকে একজন ‘প্রতারক’ বা ‘না জেনেই বেশি বুঝি’ মনে করার এই মানসিক অবস্থাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইম্পোস্টার সিনড্রোম’। এটি একধরনের মানসিক প্রবণতা, যা একজন মানুষকে নিজের অর্জন উপভোগ করতে দেয় না। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হন।
১৯৭৮ সালে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ড. পোলিন ক্ল্যান্স এবং ড. সুজান ইমস প্রথম এই ধারণা প্রবর্তন করেন। তাঁদের মতে, উচ্চমাত্রায় সফল ব্যক্তিরা যখন নিজেদের অর্জনকে অভ্যন্তরীণ মেধা বা দক্ষতার ফল না ভেবে ভাগ্য, সঠিক টাইমিং বা অন্যদের ভুলের ফল মনে করেন, তখনই ইম্পোস্টার সিনড্রোম তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে অন্যের নিখুঁত জীবনের সঙ্গে নিজের তুলনা করার সহজ সুযোগ এই অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলা যায়। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, লেখক কিংবা গবেষণাকাজে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও এই প্রবণতা রয়েছে।
ইম্পোস্টার সিনড্রোম বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। এ কারণে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন পারফেকশনিস্ট। এরা নিজের জন্য সব সময় কঠিন লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। কাজে সামান্য ত্রুটি হলেই নিজেদের ব্যর্থ মনে করেন। আবার কেউ কেউ ভাবেন, যেকোনো কাজ প্রথম চেষ্টাতেই এবং খুব দ্রুত পারা উচিত। একটু বেশি কষ্ট করতে হলে নিজেদের অযোগ্য ভাবেন। অনেকে আবার কারও সাহায্য চাওয়াকে নিজেদের দুর্বলতা বা অযোগ্যতা মনে করেন। কেউ কেউ তো অনেক ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে শতভাগ জ্ঞান না থাকলে নিজেদের দক্ষ বলে মেনে নিতে পারেন না। মানসিক সংকটের শুরু হয় এসব ভাবনা থেকেই।
চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘শৈশবের পারিবারিক পরিবেশ এবং লালন-পালন পদ্ধতি ইম্পোস্টার সিনড্রোম তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। ছোটবেলায় অতিরিক্ত সমালোচনা, ভাইবোনদের সঙ্গে ক্রমাগত তুলনা অথবা শুধু সাফল্য পেলেই প্রশংসিত হওয়ার পরিবেশ থেকে এই মনোভাবের উৎপত্তি হতে পারে।’ এ ছাড়া নতুন কর্মক্ষেত্র, পদোন্নতি বা অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সময়েও এই সংশয় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বলে জানান তিনি।
এই মনস্তাত্ত্বিক আচ্ছন্নতা মানুষের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে জানান সানজিদা শাহরিয়া। ইম্পোস্টার সিনড্রোমের কারণে অনেকে নতুন কোনো দায়িত্ব বা পদোন্নতির সুযোগ পেলেও তা ফিরিয়ে দেন। ব্যর্থতার ভয় এবং নিজেকে অযোগ্য মনে করায় অনেকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন, যা পরে তীব্র মানসিক ক্লান্তি বা বার্নআউটের দিকে ঠেলে দেয়। আবার অনেকে অযোগ্য মনে করে কাজ জমিয়ে রাখেন বা বিলম্ব করেন।
সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘আপনি নিজেকে অযোগ্য মনে করছেন মানেই কিন্তু আপনি সত্যি অযোগ্য নন। মনে রাখা দরকার, অনুভূতি সব সময় বাস্তবতা প্রকাশ করে না।’ সে ক্ষেত্রে নিজের ছোট-বড় অর্জনের নোট রাখার মতো কিছু কাজ করা যেতে পারে। এতে নিজের মেধা ও পরিশ্রমের কথা বারবার মনে পড়বে। এ ছাড়া অন্য়ের সঙ্গে নিজের তুলনা করা বাদ দিতে হবে। কারণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় বা কর্মক্ষেত্রে অন্যের শুধু উজ্জ্বল দিকটিই দেখা যায়। অন্যের প্রকাশিত রূপের সঙ্গে নিজের পেছনের পরিশ্রমের তুলনা করা বন্ধ করা জরুরি।
সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড অবলম্বনে